উচ্চশিক্ষার জন্য জার্মানি আসতে চান ? সফল হওয়ার আগ পর্যন্ত মনোবল অটুট রাখতে পারবেন তো ?



উচ্চশিক্ষার জন্য জার্মানি তে আসা খুব সহজ কাজ না সেটা অনেক সময় সাপেক্ষ । আপনারা হয়তো অনেক সাকসেস স্টোরি দেখতে পান যারা জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার জন্য আসে। ইন্টারেস্টিং বিষয় হল এদের সাকসেস স্টোরির পিছনে থাকে কঠোর পরিশ্রম, নিদ্রাহীন রাত এবং না বলা কষ্ট। এমন না যে আজ থেকে এক মাস আগে সিন্ধান্ত নিলেন আপনি জার্মানি তে পড়াশোনা করার জন্য আসবেন আর এক মাস পরেই চলে আসবেন। এটা নিঃসন্দেহে একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া, স্টেপ বাই স্টেপ বিভিন্ন ধাপ সফল ভাবে অতিক্রম করে আসতে হয়। কিন্তু আমরা অনেকেই আছি এই দীর্ঘ মেয়াদী প্রক্রিয়া টি সঠিক ভাবে মোকাবিলা করতে পারিনা উল্টো জার্মানি আসার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে নিজকে ডিপ্রেশন এ ফেলে দেই, আজকের লেখাটা তাদের জন্য। আমাদের শিক্ষা ব্যাবস্থা অনুযায়ী ব্যাক্তিগত ভাবে আমি শিক্ষার্থীদের কে তিনটি ভাগে বিগক্ত করতে চাই।

প্রথমত, ভালো ছাত্র কিংবা ছাত্রী যারা বলতে গেলে ছোট বেলা থেকেই পড়শোনায় সিরিয়াস, তাদের কাছে জীবনের লক্ষ্য আগে থেকেই সেট করা থাকে, সেটা হতে পারে পারিবারিক সূত্র ধরে কিংবা তাদের ব্যাক্তিগত প্রচেষ্টায়। এরা যদি উচ্চ শিক্ষার জন্য বিদেশে আসতে চায় তাহলে অনেক আগে থেকেই একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি IELTS এর জন্য প্রিপারেশন নেয়, একাডেমিক কোর্স শেষ হলেই IELTS এক্সাম দিয়ে একটা ভালো স্কোর তুলে এডমিশন এর প্রসেসিং শুরু করতে পারে ৷ দ্বিতীয়ত, মোটামুটি ভালো ছাত্র ছাত্রী যাদের এত পড়াশোনা করতে ভালো লাগে না, কিংবা পড়াশোনা নিয়ে এত প্রেশার তারা নিতে পারেনা, তবুও তারা চায় কিভাবে খুব কম পড়ে মোটামুটি একটা একাডেমিক রেজাল্ট ও IELTS স্কোর দিয়ে যদি দেশের বাহিরে পড়াশোনা করার জন্য যাওয়া যায় তাহলে খারাপ না, হয়তো লাইফের একটা গতি আসবে ৷ তৃতীয়ত , আমি তাদের কে রাখতে চাই যারা একে বারেই পড়াশোনা করতে চায়না, কিংবা একাডেমিক রিজাল্ট ও ভালো না কোন রকম হয়তো কিছু ভার্সিটিতে এপ্লাই করা যাবে, IELTS এদের কাছে অনেক বড় বাধা। জার্মানি আসার জন্য এরা ২ লক্ষ টাকা হয়তো বেশি খরছ করতে রাজি তবুও যদি IELTS ছাড়া ইউরোপ এর কোন দেশে যাওয়া যায়, এজেন্সি ঘুরতে ঘুরতে যখন দেখে বাংলাদেশ থেকে অন্য কোন ভিসায় বিদেশে আসা অনেক কঠিন তখন এরা বাধ্য হয়েই ষ্টুডেন্ট ভিসায় আসতে চায়। এবার আসি জার্মানি তে ষ্টুডেন্ট ভিসায় আসতে হলে শেষ পর্যন্ত নিজের মনোবল ধরে রাখা কেন গুরুত্বপূর্ণ । IELTS : প্রথমেই শিক্ষার্থীদের যে তিনটি ভাগে বিভক্ত করেছিলাম সেখানে IELTS এর জন্য প্রথম গ্রুপের সাধারণত কোন প্রেশার নিতে হয় না। এদের মধ্যে বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরাই বাসায় নিজে নিজে প্রিপারেশন নিয়ে IELTS পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে ভালো স্কোর তুলে এডমিশন এর জন্য এপ্লিকেশন প্রসেস শুরু করতে পারেন । যারা দিত্বীয় গ্রুপের অন্তর্ভুক্ত অর্থাৎ পড়াশোনায় মোটামুটি ভালো এদের কাছে IELTS অনেক কঠিন একটি পরীক্ষা, এরা হয়তো কোন ইন্সটিটিউট এ ভর্তি হয় একই সাথে বাসায় নিজে নিজে প্রিপারেশন নেয় কিন্তু মক টেস্ট এ তো ভালো স্কোর করতে পারেনা । রিডিং এর একটা প্যাসেজ নিয়ে বসলেই মাথা গরম হয়ে যায়, আবার মাঝে মাঝে মনে হয় প্রেশার ও বেড়ে যায় । যখন এক সাথে মক টেস্ট দিয়ে বন্ধু পায় ৬.৫ আর সে পায় ৫.৫ তখন ই এরা অনেক বেশি হতাশ হয়ে যায়, চিন্তা করে আমাকে দিয়ে হবেনা, আমি পারবোনা, IELTS এতো কঠিন ৷ তাদের উদ্দ্যেশ্যে বলতে চাই , বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য এটা প্রথম ধাপ, তাই খুব ঠান্ডা মাথায় হ্যান্ডেল করতে হবে। মনে রাখবেন একটু সময় নিয়ে IELTS করলে আপনার ভালো স্কোর আসবেই তাই ধৈর্য হারাবেন না, চেষ্টা চালিয়ে যান, এখানেই যদি থেমে যান তাহলে জার্মানি তে আসবেন কিভাবে?? তৃতীয় গ্রুপ, যারা একেবারেই পড়াশোনা করতে রাজি না এদের কাছে IELTS মানেই যুদ্ধ , কোন উপায়ন্তর না পেয়ে বলতে গেলে মনের বিরুদ্ধে গিয়ে কোন ইন্সটিটিউট এ ভর্তি হয় IELTS করতে। লিসেনিং, রাইটিং, রিডিং, স্পিকিং সব গুলাই এদের মাথার উপর দিয়ে যায়, ১/২ মাস ক্লাশ করে যখন ইম্পুভ করতে পারেনা তখন ই এরা প্রচন্ড রকমের ডিপ্রেশনে চলে যায়, আফসোস এর মাত্রা দিন দিন বাড়তে থাকে, এরা হতাশ হয়ে একটা সময় আর পরীক্ষাই দিতে পারেনা, এখানেই থেমে যায় তাদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন। তবে আমি বলব এখানে নিজেকে থামাবেন না, আমি এমন ও ষ্টুডেন্ট দেখেছি যারা ছয় থেকে এক বছর সময় নিয়ে একদম বেসিক ইংরেজি কোর্স থেকে শুরু করে IELTS এর প্রিপারেশন নেয়, এবং একটা সময় এরা ভালো স্কোর করে বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পায়। সুতরাং আপনি ও বিদেশে পড়াশোনার সুযোগ পাবেন শুধু ধৈর্য ধরে প্রস্তুতি টা চালিয়ে যান এবং একটা ভালো স্কোর করেন IELTS এর ধাক্কা টা সামাল দিতে পারলে বাকি ধাক্কা গুলো ও সামাল দেয়া যায়। অফার লেটার এর জন্য ভার্সিটিতে এপ্লাই : IELTS এর প্যারা শেষ হতে না হতেই আপনাদের সবার সামনে আরেক টি প্যারা এসে হাজির হবে । যেমন, কোন সাবজেক্টে এপ্লাই করবেন, কোন ইউনিভার্সিটি তে করবেন, কোন ইউনিভার্সিটির সাবজেক্ট টি আপনার প্রোফাইল এর সাথে যায় এরকম অনেক কিছু। পরিচিত বড় ভাই, বোন ও বন্ধুদের সহযোগিতা এবং সাজেশন নিয়ে শুরু করলেন ভার্সিটিতে এপ্লাই করা ৷ ধরে নিলাম ৫/৭ টা ইউনিভার্সিটিতে এপ্লাই করছেন। এবার অপেক্ষার প্রহর গণণা করা শুরু, কবে আসবে অফার লেটার, নিজে নিজে চিন্তা করতে লাগবেন আমি কি চান্স পাব? কারণ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে স্টুডেন্ট রা উচ্চশিক্ষার জন্য জার্মানি তে এপ্লাই করে তাদের সাথে ফাইট করে আপনাকে অফার লেটার পেতে হবে ৷ এভাবে দুই/তিন সপ্তাহ যাওয়ার পর হঠাৎ করে যখন জানতে পারবেন আপনার কোন বন্ধু অফার লেটার পেয়েছে তখন বন্ধুকে অভিনন্দন জানাবেন ঠিকই কিন্তু আপনার চিন্তার মাত্রা বহু গুণ বেড়ে যাবে, দিনে কত বার যে মেইল চেক করবেন তার হিসেব আপনি চাইলে ও দিতে পারবেন না, এটা যে কত বড় প্রেশার যখন নিবেন তখন টের পাবেন ৷ এমন ও হতে পারে যে ৫/৭ টি ইউনিভার্সিটি তে এপ্লাই করেছেন সব গুলা থেকেই আপনি রিজেক্ট হয়েছেন অর্থাৎ আপনাকে কোন ইউনিভার্সিটি থেকে অফার লেটার দেয় নাই, তখন কতটুকু টেনশনে পড়বেন সেটা বলা সত্যি কঠিন। যদি এ রকম সিচুয়েশন ও হয় তাহলে আমি বলব হতাশ হবেন না, এই সেমিস্টার এ অফার পান নাই তো কি হয়েছে পরের সেমিস্টারে প্রয়োজনে ১০ টি ইউনিভার্সিটি তে এপ্লাই করবেন , ইনশাআল্লাহ অফার লেটার পেয়ে যাবেন। মোট কথা চ্যালেঞ্জ নিবেন, ভূলে ও হাল ছাড়বেন না। ব্লক একাউন্ট : ভার্সিটিতে এপ্লাই করার পর যখন অফার লেটার পাবেন তখন তো আপনি ভীষণ খুশি, যতই খুশি হন না কেন প্যারা নেয়া কিন্তু এখনো শেষ হয় নাই । অফার লেটার পাওয়ার পর পরই আপনাকে ব্লক একাউন্ট এর জন্য একাউন্ট অপেন করে জার্মানিতে টাকা পাঠাতে হবে। অনেক বড় একটা এমাউন্ট ১০৪২৫ ইউরো , সবার জন্য এই টাকা টা ম্যানেজ করা খুব সহজ না ৷ অনেকেই আত্বীয়স্বজন থেকে ধার করে কিংবা ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে এই টাকা টা ম্যানেজ করে, সুতরাং এটা মেন্টালি অনেক প্রেশার দেয়। এই জন্য ব্লকের টাকা টা আগে থেকে প্রস্তুত রাখা ভালো যাতে টাকার জন্য আপনার জার্মানি আসা বন্ধ না নয়। এম্বাসি থেকে ভিসা ইন্টারভিউ এর এপায়ন্টমেন্ট নেয়া : সব কিছু মোটামুটি রেডি এখন এম্বাসিতে ইন্টারভিউ দিবেন ভিসার জন্য, আগে রাতে ভোর বেলা এপয়েন্টমেন্ট স্লট খালি পাওয়া যেত সবাই রাত জেগে দিনের পর দিন ট্রাই করে কেউ ডেইট পেত আবার অনেকেই পেত না, যেহেতু এখন সিস্টেম চেনঞ্জ হয়ে গেছে সুতরাং কবে এপয়েন্টমেন্ট পাবেন সেটা বলা মুশকিল, আপনি আবেদন করবেন এপয়েন্টমেন্ট এর জন্য এম্বাসি আপনাকে কবে ডেইট দিবে সেটা তারাই ডিসাইড করবে। দুর্ভাগ্যক্রমে যদি আপনি এম্বাসি এপয়েন্টমেন্ট না পান তাহলে সব কিছু ঠিক থাকা সত্বেও আপনার জার্মানি আসা হবেনা । তখন আপনার নেক্সট সেমিস্টার পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। হয়তো এই সময় কষ্টে আপনার বুকটা ফেটে যাবে, ইচ্ছে করবে চিৎকার দিয়ে কান্না করতে, কাউকে বলতে ও পারবেন না আবার সহ্য ও করতে পারবেন না। এই অবস্থা ও যদি ও আপনার ফেস করতে হয় তবে আমি বলব, আল্লাহর উপর ভরসা রাখুন এবং নিজেকে শক্ত করুন জার্মানি না আসার আগ পর্যন্ত চেষ্টা বন্ধ করবেন না, কাজ যখন শুরু করে দিয়েছেন তবে সফল ভাবে কাজটি শেষ করুন,তাহলে একটা সময় নিজেকে নিয়ে গর্ব করতে পারবেন। সোনার হরিণ ভিসার জন্য অপেক্ষা করা : ইন্টারভিউ ডেইট পাওয়ার পর ভালো ভাবে প্রিপারেশন নিয়ে যখন ইন্টারভিউ দিবেন এবং ডকুমেন্টস গুলো সাবমিট করে আসবেন তখন থেকে আবার সোনার হরিণ ভিসার জন্য অপেক্ষা করতে হবে ৷ ঠিক কত দিন অপেক্ষা করতে হবে সেটা আপনার ভাগ্য আর যে সিটি থেকে ভিসা ইস্যু হবে সেটার উপর ডিপেন্ড করবে ৷ অপেক্ষার এই দিনগুলো যেন যেতেই চায় না, এক এক টা দিন মনে হবে এক এক টা বছরের মত, এর মধ্যে যদি হঠাৎ খবর পান আপনার পরিচিত কোন ভাই অথবা বন্ধুর ইন্টারভিউ দেয়ার ১৭ দিন পর ভিসা হয়ে গেছে আর আপনার ২০ দিন হয়ে গেছে এখনো কোন কিছু জানায় নাই তাহলে নিশ্চিত এই রাতের ঘুম হারাম হয়ে যাবে, মাথায় শুধু চিন্তা আসবে আল্লাহ ভিসা কি হবে না কি রিফিউজ করে দিবে, বার বার শুধু ইমেইল চেক করবেন পাসপোর্ট কালেকশন এর মেইল দিলো কি না এম্বাসি থেকে? এভাবে আপনাকে লম্বা একটা সময় ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে। তার পরে ভিসা পেলে পাখির মত উড়াল দিয়ে চলে আসতে পারবেন আপনার স্বপ্নের দেশ জার্মানি তে ৷ এজন্য শিরোনামেই জিজ্ঞেস করেছিলাম শেষ পর্যন্ত মনোবল ধরে রাখতে পারবেন কি না ? কেন জিজ্ঞেস করেছিলাম আশা করি উওর পেয়েছেন ।

বিঃদ্র- ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা এবং পারিপার্শ্বিক ঘটনা থেকে বাস্তবতা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি, আমরা অনেকেই উচ্চশিক্ষার জন্য জার্মানি আসার স্বপ্ন দেখে ও আসতে পারিনা, এই বাধা গুলো সঠিক ভাবে হ্যান্ডেল করতে পারিনা বলে। যারা ভবিষৎে জার্মানি আসতে চায় আশা করি তারা এই রকম বাধার সম্মুখীন হলে সেগুলো সুন্দর ভাবে মোকাবিলা করে তাদের স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে। তাদের জন্য অনেক অনেক শুভ কামনা রইলো। শুভ কামনায় :

লেখক

খয়রুল ইসলাম এম এস সি ইন ইকোনমিকস এন্ড ফাইনান্স রাইন ওয়াল ইউনিভার্সিটি অফ এপ্লাইড সাইন্স জার্মানি এই লেখা পড়ার পরে কোন প্রশ্ন থাকলে বা মতামত দিতে চাইলে অথবা কাউকে ট্যাগ করতে চাইলে আমাদের ফেইসবুক গ্রুপে থাকা এই পোস্টে করতে পারেন।

Subscribe to Our Newsletter

© BESSiG. বিনা অনুমতিতে এই ওয়েবসাইটের কোনো কন্টেন্ট অন্য যেকোন ওয়েবসাইট বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।