উন্মত্ত ফুটবলপ্রেমিদের রাজ্যে



কোন এক শনিবারে বন্ধুদের সাথে জার্মানির সবচেয়ে বিখ্যাত স্থাপনা কোলন ক্যাথিড্রাল দেখতে গিয়েছি। ট্রেন থেকে নামতেই প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যে পড়লাম। ছেলে,বুড়ো,সুন্দরী ললনা সবার গায়ে বায়ার্ন মিউনিখের রাঙা জার্সি। জায়গায় জায়গায় পুলিশ মোতায়েন করা। তাদের কোনো তোয়াক্কা না করে দলবেঁধে সবাই সমবেত সুরে গেয়ে যাচ্ছে গান। জার্মান ভাষা খুব একটা না বুঝলেও এটা যে কোনো ক্লাব সমর্থকদের দলীয় সংগীত তা বুঝতে কোনো অসুবিধা হলো না।কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। ভুল করে কোনো স্টেডিয়ামে ঢুকে পড়লাম না তো?কোলন হাফটবানহফ তথা কোলন রেলস্টেশন জার্মানির সবচেয়ে দর্শনীয় রেলস্টেশনগুলোর মধ্যে একটি।তাই বলে রেল স্টেশনের ভিতর কোনো স্টেডিয়াম আছে বলে তো আমার জানা নেই। রহস্যটা কী?

কিছুদিন জার্মানি থাকার পর এই রহস্য আমার কাছে আর রহস্য রইলো না। আমি জার্মানির যে রাজ্যে আছি তার নাম নর্থ-রাইন ওয়েস্টফালিয়া। সমগ্র ইউরোপের তৃতীয় বৃহত্তম আরবান এরিয়া বা শহুরে এলাকা রুহর কনারবেশন এখানে অবস্থিত। বলা বাহুল্য যে জার্মানির মধ্যে এটিই সবচেয়ে বড় শহুরে বা মেট্রোপলিটন এরিয়া।জার্মানির সবচেয়ে বড় ১০ টি শহরের মধ্যে ৪ টিই এখানে অবস্থিত। আরো মজার বিষয় হলো শহরগুলোর অবস্থান খুবই কাছাকাছি। ট্রেনে করে বেশিরভাগ শহরই ১০/২০ মিনিটের দূরত্বে।


আমি যেখানে বাস করি সেই বুখোম শহর থেকে ১০ মিনিটের দূরত্বের শহর গেলসেনকিয়ের্শেন। এই শহরটির নাম কারো খুব একটা শুনার কথা না। কিন্তু যারা রেগুলার ফুটবল ফলো করে তাদের কাছে জার্মানি তথা ইউরোপের অন্যতম বিখ্যাত ক্লাব শালকে ফোর এর কথা অজানা না। হ্যাঁ,শালকে গেলসেনকিয়ের্শেন শহরের ফুটবল ক্লাব। ২০১৭-১৮ সিজনে জার্মানলিগ তথা বুন্দেসলিগার পয়েন্ট টেবিলে দ্বিতীয় স্থান অর্জন করা শালকে বিশ্বকে উপহার দিয়েছে ম্যানুয়েল নয়্যার নামের এক প্রতিভাকে। পৃথিবীর অন্যতম সেরা এই গোলকিপারের জন্মস্থান এই গেলসেনকিয়ের্শেন। রিয়াল মাদ্রিদ, আর্সেনাল আর জার্মান জাতীয় ফুটবল দলের আরেক সেনসেশন মেসুত ওজিলের শহরও এই গেলসেনকিয়ের্শেন। প্রথমবার গেলসেনকিয়ের্শেনে গিয়ে অনুভব করতে পেরেছিলাম ফুটবল কতোটা আবেগময় আর উন্মাদনার হতে পারে। যেদিন শালকের ম্যাচ থাকে সেদিন পুরো শহরই পরিণত হয় এক ভ্যালটিনস এরিনা তথা শালকের হোম গ্রাউন্ডে।হাতে বিয়ারের বোতল,গায়ে শালকের জার্সি আর গলায় শালকের স্কার্ফ পরে শালকের সমর্থকেরা সমবেত সুরে গান গেয়ে আর নেচে মাতিয়ে রাখে শহরের প্রতিটি রাস্তা,বার আর ট্রেন স্টেশন।ইউরোপের সবচেয়ে অত্যাধুনিক স্টেডিয়ামগুলোর একটি হিসাবে ভ্যালটিনস এরিনা যতটুকু পরিচিত তার চেয়ে অনেক বেশি পরিচিত এর পাগলা সমর্থকদের জন্য।উম্মত্ত এই সমর্থকেরা প্রায়ই এখানে সারে তাদের বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা বা সন্তানের ব্যাপ্টিজম। গেলশেনকিয়ের্শনে একটি সমাধিক্ষেত্র আছে যেখানে শুধুমাত্র সমাহিত করা হয় শালকে সমর্থকদের। মৃত্যুর পরো তাই অবিচ্ছেদ্য থাকে এই ফুটবল বন্ধন।

ফুটবল প্রেম কতোটা প্রগাঢ় হতে পারে তা টের পেয়েছিলাম প্রথমবার ডর্টমুন্ডগামী ট্রেনে চড়ে। বুখোম থেকে মাত্র পনেরো মিনিটের এই ভ্রমণে পুরো ট্রেনভর্তি প্রায় সব যাত্রীর পরনে ছিলো বিভিবি লেখা হলুদ জার্সি।তারা সবাই যাচ্ছে ইউরোপের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী ক্লাব বুরুশিয়া ডর্টমুন্ডের হোম স্টেডিয়াম সিগনাল ইদুনা পার্কে। সিগনাল ইদুনা পার্ক বা ওয়েস্টফালেন ইউরোপের সবচেয়ে সমৃদ্ধ আর ঐতিহাসিক ফুটবল স্টেডিয়ামগুলোর মধ্যে অন্যতম। আশি হাজারেরও বেশি দর্শক ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন জার্মানির সবচেয়ে বড় এই স্টেডিয়ামে দর্শকদের ফুটবল উন্মাদনায় মুগ্ধ হয়ে লন্ডন টাইমস একে অভিহিত করেছে এক ফুটবল মন্দির হিসাবে। দর্শকদের ফুটবল পূজার গভীরতা আর ফুটবল আবহের বিচারে লন্ডন টাইমসের মতে সিগনাল ইদুনা পার্ক বিশ্বের সেরা ফুটবল স্টেডিয়াম। জার্মান তথা ইউরোপিয়ান ফুটবলের তরুণ সেনসেশন মার্কো রয়েসের জন্ম এই ডর্টমুন্ডে। ফিফা ১৭ ভিডিও গেমের কাভার মডেল রয়েস কখনো নিজের শহর ছেড়ে অন্য ক্লাবে খেলেননি।কেনই বা ছাড়বেন? পৃথিবীর আর কোথায় তিনি ডর্টমুন্ডের মতো এতোটা আবেগী সমর্থক পাবেন? পৃথিবীর আর কোনো স্টেডিয়ামেই হয়তো সিগনাল ইদুনা পার্কের মতো প্রতিটি ম্যাচই কানায় কানায় পরিপূর্ণ থাকে না। এভারেজ এটেন্ডেন্স বা প্রতি ম্যাচে গড় দর্শক উপস্থিতির বিচারে সিগনাল ইদুনা পার্ক সবসময়ই ইউরোপের মধ্যে প্রথম। তবুও এই সংখ্যা কখনোই প্রকাশ করবে না কতোটা আবেগ,উন্মাদনা আর ফুটবল প্রেম আছে এই সমর্থকদের হৃদয়ে। ফুটবল ডার্বি আর রাইভালরি কতোটা উত্তাপ ছড়াতে পারে তার কিছুটা আঁচ পাওয়া যায় শালকে আর ডর্টমুন্ড ফ্যানদের সাথে কথা বললে।

ফুটবল উন্মাদনায় আবিষ্ট পুরো নর্থ-রাইন ওয়েস্টফালিয়া রাজ্যই। পুরো জার্মানিতে যেখানে সব মিলিয়ে প্রায় ২৬০০ ফুটবল ক্লাব আছে সেখানে এবারো জার্মানির সর্বোচ্চ লিগের সেরা ৫ টি ক্লাবের মধ্যে তিনটিই ছিলো এই অঞ্চলের। বুন্দেসলিগায় পঞ্চম স্থান অর্জন করা ক্লাব বায়ার্ন লেভারকুসেনও এখানে অবস্থিত।লেভারকুসেনের উচ্ছল সমর্থকরা ইচ্ছা করলে ম্যাচ শেষে থেকে যেতে পারেন তাদের প্রিয় ক্লাবে। তাদের জন্য স্টেডিয়ামের ভিতরেই তৈরি করা হয়েছে আধুনিক এক হোটেল। জার্মানির সেরা ক্লাবগুলোর মধ্যে এই অঞ্চলে আরো রয়েছে বুরুশিয়া মুনশেনগ্লাডবাখ,এফসি কোলন, ফর্চুনা ডুসেলডর্ফ আর এসসি পাডারবর্ন। যেদিনের ঘটনা দিয়ে এই লেখা শুরু করেছিলাম সেদিন ছিলো এফসি কোলন আর বায়ার্ন মিউনিখের মধ্যকার ম্যাচ। বার্সেলোনা আর জার্মানি জাতীয় দলের অন্যতম প্রধান গোলকিপার মার্ক আন্দ্রে টের স্টেগেন এর জন্মস্থান আর সাবেক ক্লাব এই মুনশেনগ্লাডবাখ।

বিশুদ্ধ ফুটবল প্রেম আর উচ্ছসিত সমর্থকদের কারণেই হয়তো ফুটবল প্রতিভা উপহার দেওয়ায় কখনোই পিছিয়ে থাকেনি নর্থ-রাইন ওয়েস্টফালিয়া। এবার রাশিয়া বিশ্বকাপের জন্য জার্মানির ২৩ সদস্যের জাতীয় দলের ৮ জনই এই অঞ্চলের। ম্যানুয়েল নয়্যার,মেসুত ওজিল,মার্কো রয়েস, ম্যাট হামেলস,টের স্টেগেন ছাড়াও এই দলে আরো আছেন জুলিয়ান ড্রাক্সলার,এলকায় গুন্ডোগান ও লিওন গুরেটজকা। এর মধ্যে গুরেটজকার শহর বুখোম। হ্যাঁ,আমার বর্তমান ঠিকানা বুখোম।

আমি এ রাজ্যে আছি বলে এখানকার ফুটবল উত্তাপ টের পাই। আসলে পুরো জার্মানি জুড়েই এই ফুটবল উন্মাদনা। এবারো রাশিয়া বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ টিকিট ক্রেতা জার্মানির দর্শকেরা। ফুটবল জার্মানদের অন্যরকম এক ভালোবাসার জায়গা। এ দেশে এসে আমার আর বুঝতে বাকি নেই কেন সার্বিক দিক বিবেচনায় বিশ্বকাপের ইতিহাসে সফলতম দলটির নাম জার্মানি। খেলার মাঠে মাত্র চারবার চ্যাম্পিয়ন হলেও মাঠের বাইরের উন্মাদনায় হয়তো তারা অল টাইম চ্যাম্পিয়ন। এখানে সব শ্রেণীর দর্শকদের আবেগ, উচ্ছাস আর উন্মুখতা দেখে মনে মনে ভাবি-"ফুটবল মানে তো জীবন নয়। ফুটবল এখানে জীবনের চেয়েও বেশি কিছু।"





লেখক N H Ashis Khan

এই লেখা পড়ার পরে কোন প্রশ্ন থাকলে বা মতামত দিতে চাইলে অথবা কাউকে ট্যাগ করতে চাইলে আমাদের ফেইসবুক গ্রুপের মাধ্যমে দিতে পারেন।

Subscribe to Our Newsletter

© BESSiG. বিনা অনুমতিতে এই ওয়েবসাইটের কোনো কন্টেন্ট অন্য যেকোন ওয়েবসাইট বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।