জার্মানরা বাংলাদেশকে কিভাবে দেখে


সম্পূর্ণ লেখাটা আমার বন্ধু বান্ধুবীরা বাংলাদেশ থেকে ফিরে আসার পরে, তাদের খোলাখুলি মতামতের ভিত্তিতে লেখা


আমি এর আগে জানিয়েছি আমার এই পর্যন্ত ৫ জন বিদেশী বন্ধু বান্ধুবীরা বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে বেড়াতে এসেছিলো। এ নিয়ে আমি আগের লেখাতে শেয়ার করেছিলাম বাংলাদেশে আমি কিভাবে তাদের ঘুরাঘুরি করিয়েছিলাম তার বিভিন্ন অভিজ্ঞতা। আজ শেয়ার করবো তারা বাংলাদেশ থেকে ফিরে আসার পরে তাদের খোলামেলা অভিজ্ঞতা এবং মতামত।


১। বাংলাদেশের বেস্ট জিনিস হলো বাংলা কমোড। এখানে টয়লেট করার পরে যেভাবে পেট খালি হয়, তা অন্য কমোড দিয়ে হয় না। আর পানি দিয়ে টয়লেট পরিষ্কার ১০০ ভাগ পরিবেশ সম্মত। জার্মানি এথেকে অনেক কিছু শিখতে পারে।

২। বাংলাদেশের সবচাইতে সুন্দর জিনিস হলো হরতাল। অন্য সময়ে আমার দুইজন বান্ধবী ট্রাফিক জ্যামের কারনে কোথাও যেয়ে দিনের মধ্যে কাজ শেষ করতে পারছিল না। কিন্তু হরতালের দিনে গাড়িতে করে বিভিন্ন অফিসের কাজ শেষ করে সারা দিন ঘুরতে পেরেছিলো। আমাকে আলাদা করে অনুরোধ করেছিলো আর কবে কবে হরতাল আছে, তাহলে সে দিন তারা সব অফিস বা ভিসার কাজ শেষ করবে।

৩। যেখানে সেখানে ময়লা ফেলার আইডিয়াটা খুবই ভালো। তাদের মতে তারা জার্মান সরকারকে খুব হাই ট্যাক্স দেয়, কিন্তু ময়লা নিয়ে খুব ঝামেলা পোহাতে হয়। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার তেমন ট্যাক্স নেয় না, কিন্তু যেকোনো জায়গা থেকে ময়লা পরিষ্কার করে। এটা জার্মানির জন্য একটা মডেল হতে পারে।

৪। বাংলাদেশের জাতীয় খাবার দুধ চা। মানুষ পানির থেকে এখানে চা বেশি খায়।

৫। বাংলাদেশের জনসংখ্যা সমস্যার জন্য মূল কারন, এখানকার মানুষের (পুরুষ এবং মহিলারা) লুঙ্গি এবং শাড়ি পরে। তাদের দৃষ্টিতে এটা আসলে সবাই অর্ধ উলঙ্গ থাকে। জাস্ট একটা কাপড়কে কোমরে পেঁচিয়ে রাখে, আর মেয়েদের কাপড়টা একটু লম্বা হয় এই যা। আর দুই ক্ষেত্রেই আসলে কাপড় কোমরে পেঁচিয়ে গিট্টা মারে। আর জার্মানরা সবসময় জিন্স বা প্যান্ট পরে। তাই আসল কাজের সময় (বুঝে নেন কোন কাজ) বাংলাদেশিরা অন্য সবার চাইতে দ্রুত তৈরি হতে পারে, আর তার জন্য বাংলাদেশে জনসংখ্যা এতো বেশি। বাকিটা বুঝে নেন। (কমেন্ট করার সময় শালীনতার দিকে খেয়াল রাখবেন)

৬। বাংলাদেশের বেস্ট নাস্তা দুধ চায়ের সাথে পরোটা চুবিয়ে খাওয়া আর ওভারঅল বেস্ট খাবার ভাপা পিঠা।

৭। বাংলাদেশে যাওয়ার আগে প্রায় প্রশ্ন করতো এতো ছোট দেশে কিভাবে ১৮ কোটি মানুষ থাকে? মানুষ কি সবাই দাঁড়িয়ে থাকে। এখন আসার পরে বলে বাংলাদেশে যত খালি জায়গা আছে তাতে আরও ১৮ কোটি মানুষ ধরবে। কোনো প্রবলেম হবে না।

৮। বাংলাদেশ আসলে গরিব দেশ না। এরা বিশ্বের অন্য দেশের কাছে গরিব বলে কারন যাতে বাংলাদেশে বিভিন্ন অনুদান আসে। এর জন্য বাংলাদেশের পলিটিশিয়ানদের মেধার প্রশংসা করতে হয়।

৯। এখানকার মানুষেরা ব্রিলিয়ান্ট হয় কারন এরা বেশি মরিচ খায়। মরিচ খেলে প্রথমে খুব ঝাল লাগে, কিন্তু পরে মাথা ফ্রেস হয়ে যায়। তাই এখানকার মানুষদের মুখস্থ করার ক্ষমতা ভালো।

১০। আমার বন্ধু Michael বাংলাদেশে আসার কিছু দিন আগে আমার দাদু মারা গিয়েছিলেন। তাই সে থাকা অবস্থায় আমরা গ্রামের বাড়িতে ৪০ শা খাবারের ব্যবস্থা করেছিলাম। সেখানে গ্রামের সব মুরুব্বিদের এবং গরীব মানুষের খাওয়াবার ব্যবস্থা ছিল। আমরা তখন Michael কে গ্রামের বাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলাম। সে ওখানকার আয়োজনে এতই আশ্চর্য হয়েছিলো, যে কারো মৃত্যু উপলক্ষ্যে যে এভাবে খাওয়ানোর উৎসব হয় তা নাকি জীবনে সে প্রথম দেখেছে। একে তার ভাষায় বলা হয়েছে Death festival, তার মতে এখানে নাকি বিয়ে বাড়ির মতই উৎসব করে মানুষ খাওয়ানো হয়। তার দুঃখ ছিল, এই ফেস্টিভ্যালে কেন সে কোন গিফট নিয়ে আসে নি। আমরা বুঝাতেই পারিনি যে, এটা আসলে দুঃখের খাওয়ানো।

১১। বাংলাদেশের সকল লোকাল বাসে মহিলাদের জন্য আলাদা করে বসার জায়গা আছে। এথেকে বুঝা যায় দেশের মানুষ মহিলাদেরকে কতো রেস্পেক্ট করে।

১২। দেশে কেউ ট্রাফিক আইন মানে না। চালকেরা যেখানে সেখানে গাড়ি চালায় আবার গাড়ির ড্রাইভাররা যে কাউকে যেকোনো সময়ে যেকোনো রাস্তা পার হতে সাহায্য করে। আসলে বাংলাদেশের এটা সব চাইতে সুন্দর দিক। এর দ্বারা একজন আরেক জনকে রেস্পেক্ট করছে। এখানে ট্রাফিক পুলিশের দরকার নেই। আমার এক বন্ধু বলেছে গাড়ি আসলে বাংলাদেশেই চালিয়ে মজা। যেখানে সেখানে পার্কিং করা যায়, আবার যেকোনো রাস্তায়, যেভাবে খুশি চালানো যায়। জার্মানরা এটা বাংলাদেশ থেকে শিখতে পারে।

১৩। বাংলাদেশের ব্যান্ড এর গান গুলো খুবই বাজে। বাংলাদেশের সেরা গান হলো রবীন্দ্র সঙ্গীত। এই গান না বুঝা গেলেও যে আবেগ নিয়ে গানটা যায়, তা অনুভব করা যায়। আমার বন্ধু Michael বাংলাদেশ থেকে আসার পরে তার বাসায় নিয়ে গিয়েছিলো শুধু কিছু রবীন্দ্র সঙ্গীতকে ইংরেজীতে অনুবাদ করে দেবার জন্য।

১৪। আমার বন্ধুর বাংলাদেশে সব চাইতে বিব্রত অভিজ্ঞতা ছিল, বিয়ে বাড়িতে যখন সারা দিন আনন্দ করার পরে দেখলো কনে কাঁদতে কাঁদতে অবস্থা খারাপ। আমার বন্ধু Michael মনে করেছিলো কনের কাছের কেউ মারা গিয়েছে। সে খুব নার্ভাস হয়ে গিয়েছিলো। আরও দেখলো কনের মা, বোন সবাই কাঁদতেছে। পরে শুনলো কেউ মারা যায়নি, আসলে বিয়ে উপলক্ষ্যে এমন কনের কান্না। তার মতে কনের বিয়েতে এতো দুঃখ থাকলে বিয়ে করছে কেনো? সে পরে কান্নার কারন শুনে বুঝতে পারল না, সেও কাঁদবে না হাসবে। এখনো এটা তার কাছে একটা হাস্যকর গোলক ধাঁধাঁর মতো। আমি খুব কঠোরভাবে যে কয়েকটা জিনিস মেন্টেইন করি তার মধ্যে একটা হল ফেইসবুকে আমার ছবি শেয়ার করা। কিন্তু লেখার সাথে প্রাসঙ্গিক হওয়াতে এই প্রথমবারের মতো আমার ঐ সব বন্ধুদের সাথে আমার খুব ব্যক্তিগত ফটো শেয়ার করলাম।

ফটোর বর্ণনা


ফটো ২ এবং ৩: আমার দুই বান্ধবীদের সাথে আমি, আমার বাসায় (আমার আম্মু - আব্বু, ভাই সহ)

ফটো ৪: আমার বন্ধু Tobias বাংলাদেশ থেকে আসার পরে কম্পিউটারে তার সুন্দর অভিজ্ঞতার ছবিগুলো আমাকে দেখাচ্ছে। তার পরিবারকে বাংলাদেশী স্টাইলের দুধ চা বানানো শিখিয়ে আসতে হয়েছে।


ফটো ১: আমার বন্ধু Michael এর বাসায় দেশ থেকে আসার পরে রবীন্দ্র সঙ্গীতকে ইংরেজীতে অনুবাদ করার সময়ে। পিছনে দেশ থেকে আনা বিভিন্ন মশলা।



ফটো ২ এবং ৩: আমার দুই বান্ধবীদের সাথে আমি, আমার বাসায় (আমার আম্মু - আব্বু, ভাই সহ)

ফটো ৪: আমার বন্ধু Tobias বাংলাদেশ থেকে আসার পরে কম্পিউটারে তার সুন্দর অভিজ্ঞতার ছবিগুলো আমাকে দেখাচ্ছে। তার পরিবারকে বাংলাদেশী স্টাইলের দুধ চা বানানো শিখিয়ে আসতে হয়েছে।


লেখক Nur Mohammad

এই লেখা পড়ার পরে কোন প্রশ্ন থাকলে বা মতামত দিতে চাইলে অথবা কাউকে ট্যাগ করতে চাইলে

Subscribe to Our Newsletter

© BESSiG. বিনা অনুমতিতে এই ওয়েবসাইটের কোনো কন্টেন্ট অন্য যেকোন ওয়েবসাইট বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।