জার্মানরা বাংলাদেশে গেলে কিভাবে দেশকে দেখাবেন (আমার অভিজ্ঞতা)


দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার কারনে বিদেশী বন্ধুদের মাঝে দেশকে তুলে ধরার সুযোগ পেলে কখনই ছাড়ি না। এই ক্ষেত্রে আমার অভিজ্ঞতা হয়তো বা আপনাদের কাজ দিতে পারে। আমার সর্বমোট ৫ জন (৪ জন জার্মান। আর একজন পূর্তগিজ) বন্ধু ভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে গেছে। তার মধ্যে প্রথমজন একা (জার্মান মেয়ে) বাংলাদেশে যেয়ে অত্যন্ত তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে এসেছে। সে সারা সময়ে ঢাকা এবং টঙ্গী ছিল। তার পুরো অভিজ্ঞতা ছিল তিক্তকর। কারন আমি তাকে অন্যান্য বাংলাদেশীদের মতো টিপিক্যাল পরামর্শ দিয়েছিলাম। তারপরে আমার পরিকল্পনা পরিবর্তন করবার পরে বাকি ৪ জন খুব খুশি মনে বাংলাদেশ থেকে ফেরত এসেছে। শেষ জন (এক পূর্তগিজ মেয়ে) মাস দুয়েক আগে ঘুরে এসেছে। আর আমার বন্ধুরা (যে বা যারাই) যখনই বাংলাদেশে গিয়েছিলো, তখন আমাদের পরিবারের সাথেই পুরো সময় ছিল। তার মধ্যে আমার এক বন্ধু মাইকেল, মাইঞ্জ শহর থেকে সবার খারাপ পরামর্শ উপেক্ষা করে বাংলাদেশ গিয়েছিলো। তার কাছে পরে তা এতই ভালো লেগেছিল যে, সে দুইবার বাংলাদেশ সফর করেছিলো। শেষে তো সে এক বাংলাদেশী মেয়েকে বিয়ে করার জন্য পাগল হয়ে গিয়েছিলো। (সে আরেক বিশাল কাহিনি)

আপনি যদি টিপিক্যাল্ভাবে বিদেশীদের সাথে আগান তাহলে আপনার বন্ধুরা বাংলাদেশকে মোটেও উপভোগ করবে না। এবার আমার টিপস।

১। তাকে এসি বাস বা গাড়িতে ঘুরাবার কোন দরকার নেই। সে এসব জার্মানিতে দেখতে অভস্থ্য। তার উচিৎ রিকশায় ঘুরা বা সাইকেল কিনে ঘুরা।

২। তার উচিৎ হোটেলে থাকার বদলে কোন পরিবারের সাথে থাকা। হোটেলের টাকা ঐ পরিবারকে দিলেই হবে। বাংলাদেশে হোটেলে থাকলে বিদেশিরা দেশের কালচার সম্বন্ধে, রান্না সম্বন্ধে, ছেলে মেয়েদের চিন্তা ভাবনা সম্বন্ধে কোন ধারনা পায় না।

৩। তার সামনে পিঠা বানিয়ে খাওয়ানো। বিশেষ করে ভাপা পিঠা বানাবার পদ্ধতি দেখে আমার বন্ধুরা পাগল হয়ে গিয়েছিলো। তাছাড়াও নারিকেল, গুড়ের পিঠাকে ওরা খুব পছন্দ করে। হেলদি এবং বায়ো পিঠা বলে (হাহাহা)। তবে আলাদা চিনি দেবার দরকার নেই।

৪। তার সামনে নারিকেল পেড়ে খাওয়াতে পারলে ভালো হয়। বিশেষ করে কিভাবে নারিকেল গাছে মানুষ উঠে তা নাকি তারা জীবনেও দেখেনি। এটা নিয়ে তারা ফেইসবুকে লাইভ ও করেছে।

৫। শুধু শুধু আমাদের পরিচিত, ঢাকার বিভিন্ন ফেমাস জায়গা যেমন সোনারগাঁও বা সংসদ ভবন এলাকাতে নেবার কোন দরকার নেই। জার্মানিতে তারা এই সব এলাকার চাইতেও ভালো এলাকা দেখে বড় হয়েছে। তাকে নিয়ে সাধারন বাংলাদেশ ট্রেনে করে বরং গ্রামের বাড়ি ঘুরিয়ে আনবেন। বাংলাদেশ ট্রেনের জার্নি আমার বন্ধুরা খুব পছন্দ করেছিলো। এখানকার ভালো ট্রেনের চাইতে তাদের কাছে জানালা খোলা যায় এমন ট্রেন বেশ ভালো লেগেছিল।

৬। গ্রামে বা শহরে রাতে চাঁদের আলোতে ব্যাডমিন্টন খেলাতে পারলে ভালো হয়। আমার বন্ধুরা বলেছিল এটা তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞতা।

৭। সব চাইতে আকর্ষণীয় হবে, তাকে কোন বিয়ের দাওয়াতে নিয়ে যাওয়া। বিশেষ করে গায়ে হলুদ, বিয়ে এবং বৌভাত পারলে সব গুলিতেই। তাদের জন্য এটা ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা যে কিভাবে এক বিয়েতে কয়েক হাজার মানুষ খায়, বিয়ের গেইট ধরা, জামাই বউয়ের মঞ্চ সাজানো ইত্যাদি। তাছাড়াও কিভাবে এক বিয়ের অনুষ্ঠান কয়েকদিন ধরে ধাপে ধাপে চলে।

৮। সাধারন রিকশা বা ট্যাক্সিতেই চলাফেরা করাবেন।

৯। গ্রামের বাড়িতে পুকুরে মাছ ধরানো, তা রান্না করে খাওয়ানো, পারলে হালকা মশলা দিয়ে রান্না করা শিখানো, এসব এরা খুব পছন্দ করে। বলা যায় পাগল।

১০। তাকে নিয়ে মার্কেটিং করা, সেখানে দামাদামি করা, বিভিন্ন পন্য থেকে পছন্দ করে বাছাই করা এসব তার পছন্দ হবে।

১১। তাকে যতো বেশি ঢাকার বাহিরে বিশেষ করে গ্রামের দিকে নেয়া যাবে তত ভালো হবে।

১২। তাকে বাহিরে বড় ভালো মানের লাগজারিয়াস রেস্টুরেন্ট খাওয়ানোর বদলে সাধারন ভাতের হোটেলে খাওয়াবেন। আমার বিদেশী বন্ধুদের মতে এসব হোটেলের রান্না নাকি খুবই ভালো। আর আশেপাশের মানুষদের হাত দিয়ে খাওয়া দেখলেই নাকি তাদেরও খিদা বেড়ে যায়। আর নোংরা হোটেলের খাবার নাকি বেশি মজাদার।

১৩। জেলে পল্লি বা গ্রামের জীবন যাত্রা, গ্রামের বাজার বা হাঁট বিদেশিদেরকে খুব টানে। পারলে তাদেরকে নৌকাতে করে ঘুরিয়ে দেখানো যায়।

১৪। আমার আরেক বন্ধু ফ্লরিয়ান খুলনা গিয়েছিলো। সেখানে সুন্দর বনের ভিতরে মধু সংগ্রহ নিয়ে এক ডকুমেন্টারি বানিয়ে ছিল। তা পরে জার্মান চ্যানেল RTL এ দেখানো হয়েছিলো। তার মতে বাংলাদেশ হল একটা ট্রেজার, কিন্তু মানুষেরা নিজেরাও জানেনা কতো চমতকার কালচার তাদের আছে। সে বাংলাদেশে সবসময় মাটির চুলায় রান্না করা খাবার খেতো। তার কাছে এমন চুলা ছিল নেশার মতো।

আমাদের মধ্যে ভুল ধারনা আছে, দেশের আইন শৃঙ্খলা খুবই খারাপ। এটা ভুল। আমার প্রতিটা বিদেশী বন্ধু প্রায় সময় একা গভীর রাত পর্যন্ত চলাফেরা করেছে। এমনকি অনেক ক্রাইম এলাকাতেও একা ঘুরেছে। কোথাও কখনো খারাপ অভিজ্ঞতায় পড়েনি। আমার বন্ধুরা সবাই নোকিয়া ১৯৯৮ সালের বাটন মোবাইল ব্যবহার করতো। এটা জার্মানি থেকে বিশেষ করে কিনে নিয়ে যেতে বলতাম।

সবশেষে অনুরোধ আমাদের দেশে আমরা যেভাবে চলি ঠিক সেভাবে দেখাবেন। জার্মানদের মতো আমাদের ইতিহাস, সিস্টেম, আইন কিছুই নেই। কিন্তু আমরা যেভাবে চলি এটা জার্মানরা তা কখনই পারে না। তাই তাদেরকে আমরা মেকি না দেখিয়ে সাধারনভাবে দেখাবো। ওরা এটাই চায়।

বি: দ্র: আমার বন্ধু মাইকেলকে তার পরিবার, তার অন্য সকল বন্ধুরা, বাংলাদেশের জার্মান এম্ব্যাসি মানা করার পরেও বাংলাদেশে এসেছিলো। প্রথমবার এক সপ্তাহের জায়গায় আড়াই মাস, আর দ্বিতীয় বার ৩ মাস থেকে গিয়েছিলো। এবার নাকি সে তার আব্বা আম্মাকে নিয়ে বাংলাদেশে আসতে চায়। দেখা যাক। আপনি উপকার পেলে আমাদের এই BESSiG গ্রুপে আপনাকে ২০জন মেম্বারকে যোগ করিয়ে দেবার অনুরোধ রইলো। তাহলে চেষ্টাটা ভালো লাগবে।

Photo Credit / CopyRight: শাহিন দিল-রিয়াজ / MAYALOK Filmproduction।


লেখক Nur Mohammad


এই লেখা পড়ার পরে কোন প্রশ্ন থাকলে বা মতামত দিতে চাইলে অথবা কাউকে ট্যাগ করতে চাইলে



Subscribe to Our Newsletter

© BESSiG. বিনা অনুমতিতে এই ওয়েবসাইটের কোনো কন্টেন্ট অন্য যেকোন ওয়েবসাইট বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।