জার্মানি আর জার্মান জীবনের অজানা কথনঃ স্নো হোয়াইট, আইনস্টাইন আর বিয়ার প্রেমীদের দেশে


লিখেছেনঃ এন এইচ আশিস খান

MA in English and American Studies, Ruhr-Universität Bochum, Germany

বিশ্বকাপ, বিশ্বযুদ্ধ, বিশ্বসেরা সব গাড়ি কিংবা হোমিওপ্যাথিক ঔষধ, জার্মানি কিংবা জার্মান যে নামেই ডাকেন না কেন এ দেশটি সম্পর্কে কম বেশি আপনিও জানেন। প্রায় বিনামূল্যে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা সরবরাহ করায় বিদেশে পাড়ি দেয়ার স্বপ্নে বিভোর বাংলাদেশের হাজারো ছাত্র/ছাত্রীর মতো জার্মানি নিয়ে আমার আগ্রহও কম ছিলো না। জার্মানি সম্পর্কে বাকি সবার মতোই কিছু ধারণা নিয়ে এখানে এসে নতুন অনেক কিছু দেখে কখনো বিস্মিত আবার কখনো বিমোহিত হয়েছি। জার্মানিতে পড়াশোনা করে জার্মান জীবনের অনেক নতুন কিছুর সাথে পরিচিত হয়েছি যা জার্মানিতে বসবাস না করা বেশিরভাগ মানুষের কাছেই অজানা। আমার চোখে দেখা জার্মানির এরকম কিছু কম গুরুত্বপূর্ণ অথচ জার্মান জীবনের অপরিহার্য বিষয় নিয়ে আজকের জার্মানি কথন। জার্মানি নিয়ে আগ্রহ থাকলে এ বিষয়গুলো জেনে আপনারও আমার মতো বিমোহিত হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যাচ্ছে না।


মশারীবিহীন জীবনঃ পৃথিবীর সমগ্র যুদ্ধে যত বেশি লোক মারা গেছে তার চেয়ে অনেক বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে মশার কামড়ে। মানব সভ্যতার ইতিহাসে মশার ভূমিকা অনেক। একজন বাংলাদেশী হিসাবে আমার চেয়ে ভালো একথা আর কেউ জানে না। জার্মানিতে এসে অনেক নতুন কিছুর দেখা পেলেও কোথাও দেখা পাইনি ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এই পতঙ্গের।পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার প্রতি জার্মানদের অবসেশনের কারনেই কিনা জানিনা জার্মানিতে এসে আমার মশার কামড় খাওয়া হয়নি। অনেকের কাছে শুনেছি জার্মানির কোনো কোনো এরিয়াতে নাকি মশা আছে কিন্তু আমি কোথাও পাইনি। কয়েল, স্প্রে আর মশারী ছাড়াও যে একটা জীবন আছে জার্মানি না আসলে এ কথা হয়তো আমার অজানাই থেকে যেতো।


নীল চোখ আর স্বর্ণকেশীদের দেশঃ গাড় নীল চোখ আর মাথা ভর্তি ব্লন্ড হেয়ার বা স্বর্ণকেশ, পুরুষ হোক অথবা নারী, এই হলো একজন ট্রেডমার্ক জার্মানের বৃত্তান্ত। পৃথিবীর বাকি সব দেশের মতোই জার্মানদের মধ্যেও রয়েছে নানা আকার, বর্ণ আর ধর্ম। তবে এই ইউনিক ফিচার ফলো করলে বেশিরভাগ জার্মানদেরই সহজে অন্যদের থেকে আলাদা করা যায়।


শুধু জার্মানদের দেশ নাঃ জার্মানিতে এসে আপনি শুধু জার্মানদের দেখা পাবেন এ কথা ভাবলে আপনার এখনো অনেক কিছুই জানার আর দেখার বাকি। আমেরিকার পর পৃথিবীর সব দেশের অভিবাসীদের দ্বিতীয় পছন্দের দেশ বলেই হয়তো জার্মানির রাস্তায় হাঁটতে গিয়ে শত শত মানুষের সাথে দেখা হওয়ার পরো মাঝে মাঝে আনমনে ভাবি-"আজ কি কোনো জার্মানের সাথে দেখা হয়েছে?" জার্মানিতে এসে পৃথিবীর খুব কম দেশই আছে যেখানের মানুষের সাথে দেখা হয়নি।জার্মানির জনসংখ্যার একটা বড় অংশই টার্কিশ জনগোষ্ঠী। কয়েক প্রজন্ম ধরে এখানে সেটেল হয়ে যাওয়ায় জার্মানির সর্বত্রই আপনি তুর্কী বংশদ্ভূত অনেক মানুষের দেখা পাবেন। একই ভাবে ইটালি, পোল্যান্ড ছাড়াও পূর্ব ইউরোপের অনেক দেশের মানুষদের স্থায়ী ঠিকানা এখন জার্মানি।


জার্মান শুধু জার্মানদের ভাষা নাঃ কিছুদিন আগে পোল্যান্ড ভ্রমণে গিয়ে এয়ারপোর্টে নামার পর পোলিশ ইমিগ্রেশন পুলিশ আমার কাগজপত্র দেখে যখন পরিষ্কার জার্মান ভাষায় জিজ্ঞেস করলো আমি জার্মান জানি কিনা তখন লজ্জিত হয়েছি কিন্তু অবাক হইনি।রাশিয়ান বাদ দিলে ইউরোপের সবচেয়ে বেশি মানুষের নেটিভ ল্যাংগুয়েজ এই জার্মান ভাষা জার্মানি ছাড়াও অস্ট্রিয়া, সুইজারল্যান্ড,বেলজিয়াম,লুক্সেমবার্গ আর লিখটেনস্টাইনের অফিশিয়াল ভাষা। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ঘুরতে গিয়ে যখন বেশিরভাগ দেশেই ইংরেজির পাশাপাশি জার্মান ভাষায় দেওয়া ট্যুরিস্ট নির্দেশনা দেখি তখন জার্মান ভাষার অজ্ঞতা আমাকে আরেকটু বেশি পোড়ায়।


জার্মানদের ক্যাশপ্রীতিঃ তথ্য প্রযুক্তি আর বিশ্ব অর্থনীতিতে দাপিয়ে বেড়ালেও অদ্ভুতভাবে ক্রেডিট কার্ড বা ডেবিট কার্ড ব্যাবহারে জার্মানদের যতো অনীহা। ইউরোপের অন্যান্য দেশে গিয়ে যেখানে রাস্তার মোড়ের কিয়স্ক বা ছোট দোকানেও কার্ড দিয়ে পে করতে সমস্যা হয়না সেখানে জার্মানির বিশাল বিশাল স্টোরেও প্রায়ই কার্ড দিয়ে পে করতে গিয়ে পড়তে হয় বিড়ম্বনায়। লেনদেনের ক্ষেত্রে জার্মানদের অনন্য ক্যাশ প্রীতির কারণেই এখানে আপনি চাইলেই সব জায়গায় কার্ড ব্যবহার করতে পারবেন না। জার্মানির বেশিরভাগ লেনদেনই তাই এখনো হয় ক্যাশ টাকায়।


খালি বোতল ফেলে দিতে নেইঃ পরিবেশ সংরক্ষণে রিসাইক্লিং এর ক্ষেত্রে জার্মানদের জুড়ি মেলা ভার। ব্যবহারের পর খালি বোতল ফেলে দেয়াকে নিরুৎসাহিত করতে তাই জার্মানির আছে অনন্য এক পদ্ধতি। ছুড়ে ফেলে না দিয়ে এই প্লাস্টিক আর কাঁচের বোতল প্রায় সব সুপার শপে অবস্থিত মেশিনে নিয়ে জমা দিলেই প্রতিটি বোতলের জন্য আপনি পাবেন টাকা। সুপার শপে কেনাকাটা করতে গিয়ে কেউ যখন ব্যাগভর্তি খালি বোতল নিয়ে রওনা হয় তা দেখে এখানে কেউ তাই অবাক হয় না। এক পার্টির সব বোতল জমা দিয়ে আরেকটা ছোটখাটো পার্টির টাকা ম্যানেজ হয়ে যাওয়াটা এখানে অস্বাভাবিক কিছু না। জার্মানিতে তাই পারতপক্ষে কেউ খালি বোতল ছুড়ে ফেলে না। তারপরো যদি ব্যবহারের পর আপনি খালি বোতল ডাস্টবিনে ছুড়ে ফেলেন খুব বেশি ক্ষতি হবে না । কারণ তখনো নিজের অজান্তেই আপনি অনেক মানুষদের জীবন ধারণে অবদান রাখবেন। দরিদ্র আর সহায় সম্বলহীন অনেক মানুষই এখানে এই ফেলে দেয়া বোতল সংগ্রহ করার টাকা দিয়ে বেঁচে থাকার পথ খুঁজে।


রবিবারে কোনো কেনাকাটা নয়ঃ সারা সপ্তাহ কাজ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিন রবিবারকে রেখে দিয়েছেন শপিং করার জন্য? কিংবা রবিবার সকালে ঘুম থেকে উঠে যদি আপনার মনে পড়ে যে ঘরের চাল শেষ হয়ে গেছে তখন আবার বিছানায় ফিরে যাওয়া ছাড়া জার্মানিতে আপনার অন্য কোনো অপশন নেই। রবিবারের জার্মানি যেন এক গোস্ট টাউন। শুধু কিছু রেস্টুরেন্ট বাদে এদিন সব দোকান পাট বন্ধ থাকে।সপ্তাহের এই একটা ছুটির দিন জার্মানরা রেখে দিয়েছে নিজের ঘরে থেকে উপভোগ করার জন্য। রবিবারে জার্মানির রাস্তা-ঘাট আর শহরগুলো তাই অনেকটাই আমাদের ঈদের সময়ের ফাঁকা ঢাকা শহরের মতো।সপ্তাহের অন্যান্য দিনগুলোতে আপনি চাইলেও ঢাকার মতো এখানে রাত দশটা/এগারোটায় শপিং করতে পারবেন না।নির্দিষ্ট কিছু সুপার শপ আর রেস্টুরেন্ট বাদে বাকি সব দোকানগুলো এখানে রাত আটটার মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়।


প্রাসাদ, অট্টালিকা আর রুপকথার দেশঃ আপনি যদি প্রতি মাসে একটি করে জার্মান ক্যাসল বা প্রাসাদ পরিদর্শন করার প্ল্যান করেন তবে জার্মানির সবগুলো ক্যাসল দেখা শেষ করতে আপনার মাত্র ১৭৫ বছর সময় লাগবে। প্রতিদিন একটি করে দেখলেও সময় লাগবে প্রায় ছয় বছর। একসাথে সৌন্দর্য আর ইতিহাসকে ধারণ করে জার্মানিতে ছোট বড় প্রায় ২১০০ ক্যাসল বা প্রাসাদ রয়েছে। ডিজনির সবচেয়ে জনপ্রিয় স্লিপিং বিউটি ক্যাসল যে প্রাসাদের অনুকরণে করা হয়েছে বাভারিয়ায় অবস্থিত সেই এক নয়েসোয়ানস্টাইন ক্যাসল দেখতেই প্রতিবছর ভিড় করে তের লাখেরও বেশি পর্যটক।শুধু রুপকথার প্রাসাদই না, স্নো হোয়াইট, লম্বাকেশের রুপাঞ্জেল কিংবা হেন্সেল-গ্রেটেলের মতো রুপকথার চরিত্রগুলোও কিন্তু আদতে জার্মান। পৃথিবীব্যাপি জনপ্রিয় এই চরিত্রগুলো যে জার্মানির বিখ্যাত গ্রিম ভ্রাতৃদ্বয়ের সংগ্রহ করা জার্মান রূপকথা থেকে নেওয়া। হ্যামিলনের বাশিওয়ালার হ্যামিলন শহরও কিন্তু এই জার্মানিতেই।


পানি খাবেন?স্পার্কলিং ওয়াটার নয়তোঃ জার্মানিতে পানি কিনতে গিয়ে প্রায়ই যে বিড়ম্বনার শিকার হতে হয় তার নাম স্পার্কলিং ওয়াটার। কোক বা অন্যান্য সফট ড্রিংকসের মতো সাধারণ পানিও জার্মানরা গ্যাসসহ পান করতে পছন্দ করে। সাধারণ পানি ভেবে কিনে তাই বোতল খোলার পর পানির বুদবুদ দেখে প্রায়ই ভাবি এবারো বোকামি করে কিনে ফেলেছি জার্মানদের অতি প্রিয় স্পার্কলিং ওয়াটার। স্টিল ওয়াটার পান করে বড় হওয়া আমার কাছে স্পার্কলিং ওয়াটারের স্বাদ আর গন্ধ যে নিতান্তই পরিত্যাজ্য একথা বলাই বাহুল্য। জার্মানিতে তাই পানি কেনার সময় স্টিল নাকি স্পার্কলিং তা চেক করে নেয়াটাই বুদ্ধিমানের কাজ।


সামার আর উইন্টারের ভিন্নরুপ সামারের জার্মানি আর উইন্টারের জার্মানি যেন দুটি সম্পুর্ণ আলাদা দেশ। চারদিকে সবুজ পাতা, রাস্তাঘাট আর সর্বত্র প্রাণচাঞ্চল্যে ভরা মানুষজন,নিরবিচ্ছিন্ন অপার নীল আকাশ আর রোদেভরা দিন নিয়ে জার্মান সামারের সৌন্দর্য কখনো কখনো নেশা ধরিয়ে দেয়। সামারের দিনগুলোও হয় অনেক দীর্ঘ। রাত সাড়ে দশটা/এগারোটায় সূর্য ডোবে তখন। সামার যদি হয় সূর্যভরা সুন্দরের উৎসব, তবে জার্মান উইন্টার হবে সূর্যহীন এক বিষন্নতার গান। গত উইন্টারে আমার এরিয়াতে সর্বসাকুল্যে ৪/৫ দিন সূর্যের মুখ দেখেছিলাম। শুধু রোদ না থাকলে সমস্যা ছিলো না। ৩/৪ ডিগ্রি তাপমাত্রার কনকনে ঠান্ডার সাথে দিনরাত অবিরাম পড়তে থাকা গুড়িগুড়ি বৃষ্টি নিয়ে জার্মান উইন্টার সত্যিই এক বিরক্তিকর সময়। উইন্টারের দিনগুলোও হয় অস্বাভাবিক রকম ছোট। চারটার মধ্যেই নেমে আসে সন্ধ্যা। সব গাছের পাতা ততোদিনে উধাও। তবে জার্মানিতে গাছের পাতার সবচেয়ে সুন্দর রুপ আমি দেখেছি ফল বা অটামে। অক্টোবরে শীতে শুরু হওয়ার আগে অল্প সময়ের জন্য সব গাছের পাতা লালচে হলুদ রঙ ধারণ করে যা সত্যিই মনোমুগ্ধকর। জার্মান উইন্টারের রুক্ষমূর্তি থেকে এক পশলা মুক্তি মিলাতে আসা স্নো ফল। বরফের সাদা চাদরে ঢেকে যাওয়া শুভ্র দিনগুলোই শীতের সেরা সময়।প্রথমবার স্নো ফল দেখার অনুভূতি আমাদের বাংলাদেশিদের জন্য সবসময়ই বিশেষ কিছু।সুন্দরের পসরা সাজিয়ে বসা জার্মান সামারে আপনার বাইরে থেকে ঘরে ফিরতে ইচ্ছা করবে না আর সূর্যহীন অবিরাম বর্ষণে ভরা জার্মান উইন্টারে প্রয়োজন থাকলেও আপনার ঘর ছেড়ে বাইরে যেতে ইচ্ছে করবে না।


ইমেইল নয়, মেইল জার্মান লাইফের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জায়গা হলো বাসার সামনের মেইলবক্স। চিঠির বাক্স নিয়মিত চেক না করলে আপনি বঞ্চিত হবে গুরুত্বপূর্ণ সব অফিশিয়াল কাজ থেকে। ইমেইলের ব্যাবহার থাকলেও জার্মানরা গুরুত্বপূর্ণ সব ব্যাপারে মেইল বা চিঠি ব্যাবহার করতেই পছন্দ করে।বাংলাদেশে যেখানে চিঠির ব্যবহার না হওয়ায় ডাক বিভাগ আজ বিলুপ্তির পথে সেখানে চিঠি ছাড়া আপনি জার্মান লাইফ কল্পনাও করতে পারবেন না।


স্পিড লিমিট বিহীন হাইওয়ে 'অটোবান' জার্মানিই সম্ভবত পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে আপনি পাবেন স্পিড লিমিট বিহীন হাইওয়ে, জার্মান ভাষায় যার নাম অটোবান।আমি অনেক আমেরিকানদের কথা শুনেছি যাদের অন্যতম একটি স্বপ্ন হলো জার্মানিতে এসে এই অটোবানে গাড়ি চালানো। আদতে জার্মান অটোবানের পুরো অংশ স্পিড লিমিট মুক্ত না হলেও এর একটা উল্লেখযোগ্য অংশেই আপনি ইচ্ছা করলে অবমুক্ত করতে পারেন আপনার গতির ক্ষুধা। তবে জার্মান অটোবান নিয়ে যে কথাটা প্রচলিত তা হলো- এখানে আপনি যতো জোরেই গাড়ি চালান না কেন কেউ না কেউ অবশ্যই আপনাকে ওভারটেক করে যাবে।


ডাংকে, বিট্টে আর যতোসব গ্রিটিংস জার্মানরা ঠিক কতোটা ভদ্র জাতি আপনি বুঝতে পারবেন যখন পিছন থেকে সম্পুর্ণ অজানা অপরিচিত কারো কাছ থেকে শুনবেন- ডাংকে শুন বা অসংখ্য ধন্যবাদ। এই ধন্যবাদ পাওয়ার কারণ আবিষ্কার করতে আপনার বিলম্ব হলেও আপনাকে ধন্যবাদ দিতে ওরা বিলম্ব করবে না। হয়তো ট্রেনের মধ্যে ভীড়ে দাঁড়িয়ে একটু হাঁচি দিলেন। সাথে সাথে পাশ থেকে অন্য যাত্রীদের কেউ কেউ উচ্চস্বরে 'গেসুন্ডহাইট' বলে আপনার সুস্বাস্থ্য কামনা করবে। মুখে সর্বদা হাসি না থাকলেও গ্রিট করতে জার্মানরা কখনো কার্পণ্য করে না। প্রায় সব পরিস্থিতির জন্য ওদের আছে আলাদা আলাদা গ্রিটিংস। অফিস, কর্মক্ষেত্র, দোকানপাট, ইউনিভার্সিটি, যানবাহন যেখানেই থাকেন না কেন দিনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আপনি অসংখ্যবার শুনবেন এসব জার্মান গ্রিটিংস। আমার মতো সব গ্রিটিংসের অর্থ না বুঝলেও কেউ যদি 'ডাংকে' বলে হাসিমুখে উত্তরে 'বিট্টে' বলতে ভুলবেন না।


বইপোকাদের দেশ আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেনে উঠে ভীড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে চারদিকের কোলাহল আর মানুষের কথোপকথনের মধ্যে প্রায়ই লক্ষ্য করবেন কেউ মনযোগ দিয়ে বইয়ের পাতা উল্টাচ্ছে। কিন্ডল আর ই-বুকের এই যুগেও কাগজের মলাটের বইয়ের প্রতি জার্মানদের ভালোবাসা একটুও কমেনি। বই পড়ার প্রতি এই ভালোবাসা থেকেই এখনো প্রতি বছর জার্মানিতে প্রায় ৯৪ হাজার বই প্রকাশিত হয় যা পৃথিবীর অন্য যে কোনো দেশের চেয়ে বেশি। বই কিনে যে দেউলিয়া না হয়ে উল্টো সব দিক দিয়ে সমৃদ্ধ হওয়া যায় পৃথিবীর চতুর্থ বৃহৎ অর্থনীতির দেশ জার্মানি বুঝি এরই প্রমাণ দেয়।


কালো নয় নীল কালিতে লেখা ইউনিভার্সিটির ক্লাসে গিয়ে প্রথম যে ছোট একটি বিষয় আমার কাছে কিছুটা অবাক লেগেছিলো তা হলো নীল কালির প্রতি জার্মানদের ভালোবাসা। বাংলাদেশে যেখানে পরীক্ষা বা অন্যান্য ক্ষেত্রে কালো কালির কলম ছাড়া অন্য কালার ব্যবহার করা যাবে কিনা তা জেনে নিতে হয় সেখানে জার্মানিতে কালো কালির কলমের ব্যবহার কদাচিৎ চোখে পড়ে। ক্লাসের নোট, পরীক্ষার খাতা কিংবা অফিসের ফাইল সব জায়গায়ই দেখা যাবে জার্মানদের প্রিয় নীল কালির কলমের লেখা।


সঠিক জায়গায় দাঁড়িয়েছেন তো? পিছন থেকে যদি কোনো স্ট্রেঞ্জারের হাক শুনতে না চান তবে জার্মানিতে আপনার দাঁড়ানোর বা হাঁটার সঠিক জায়গা বুঝে নিন। এস্কেলেটরে উঠে কখনো বাম পাশে দাঁড়াবেন না। ঠিক সময় মতো ট্রেন ধরার তাড়া বা কাজ থাকা মানুষদের বিহ্বল দৌড় বা হেঁটে চলন্ত সিড়ি বেয়ে ওপরে উঠাকে ব্যাহত না করার জন্য সব সময় এস্কেলেটরের বাঁ পাশটা রেখে দেওয়া হয়। একইভাবে ফুটপাত বা পেভমেন্টে হাঁটার সময় দ্রুতবেগে ছুটে আসা কোনো বাইসাইকেল আরোহীর বিরক্তির কারণ না হতে চাইলেও ভালো করে খেয়াল করে হাঁটুন। হাঁটার রাস্তা আর বাইসাইকেল লেন পাশাপাশি হলেও মার্ক খেয়াল করলে সঠিক পথ চিনে নিতে কষ্ট হয় না।


বিয়ার প্রেমী জাতি জার্মানদের বিয়ার প্রেমের সাথে শুধু তুলনা হতে পারে আইরিশদের বিয়ার আসক্তির।জার্মানদের বিয়ার প্রেম দেখতে হলে আপনার কোনো বার বা পার্টিতে যেতে হবে না।শুক্রবার আর শনিবার রাতে জার্মানির ট্রেনে চড়লে কিংবা গভীর রাতে রাস্তায় হাঁটাহাটি করলে চারদিকে বিয়ার হাতে ড্রাংক লোকজনের সংখ্যা দেখলে আপনি সহজেই তা অনুধাবন করতে পারবেন। জার্মানি এমন এক দেশ যেখানে প্রকাশ্যে ধুমপান করা শাস্তিযোগ্য অপরাধ কিন্তু প্রকাশ্যে বিয়ার পানে কোনো বাধা নেই। জার্মান বিয়ারের স্বাদের খ্যাতিও বিশ্বজোড়া। প্রায় প্রতিটি শহর আর অঞ্চলের নিজস্ব ফ্লেভার আর নিজস্ব ব্র‍্যান্ডের বিয়ার থাকায় শুধু জার্মানিতেই আপনি পাবেন প্রায় ১৫০০ বিয়ার ব্র‍্যান্ড। জার্মানির বাভারিয়া রাজ্যে বিয়ারকে অফিশিয়ালি একটি ফুড হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এই বাভারিয়ার রাজধানী মিউনিখেই প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয় পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফোক ফেস্টিভ্যাল 'অক্টোবর ফেস্ট'। ১৮১০ সাল থেকে শুরু হওয়া ১৬-১৮ দিন ব্যাপি এই ফেস্টিভালে জার্মানি ও পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা প্রায় দেড়লক্ষ মানুষ একসাথে বিয়ার পান করে। মিউনিখ থেকে কিছুটা দূরে থাকায় পড়াশোনা,কাজের চাপ আর অন্যান্য ব্যাস্ততায় বেশ কয়েকবার টিকিট কেটেও প্রায় পঞ্চাশ/ষাটলক্ষ মানুষের এই উৎসবে এখনো যেতে পারিনি বলে গ্লাসভর্তি বিয়ার নিয়ে লক্ষ মানুষের একসাথে 'প্রোস্ট' বলে একই গানের সুরে নেচে উঠার বিচিত্র দৃশ্য এখনো দেখা হয়নি আমার।


দেরি করে আসা যেখানে অপরাধ আপনি যদি ভেবে থাকেন যে ইউরোপিয়ান মানেই পাংচুয়াল তাহলে আপনি জার্মানদের মুখে ইটালিয়ান আর স্পেনিশদের সময় মেনে না চলার অভিযোগগুলো এখনো শোনেননি। জার্মানরা সবই মেনে নিতে পারবে, শুধু আপনার দেরি করে আসা ছাড়া। রোদ, বৃষ্টি বা প্রচন্ড তুষারপাত যাই হোক না কেন জার্মানরা কখনোই এক মিনিট দেরি করেও আসবে না। সব সময় লেট লতিফ আমাকে প্রায়ই দেরি করে ক্লাসে যাওয়ার পর প্রফেসরদের ওয়ার্নিং আর সহপাঠীদের কুচকানু ভ্রু দেখতে হয়। সামান্য ঘুরতে যাওয়ার জন্য দেখা করার সময়ও জার্মান বন্ধুদের আমার জন্য প্রতিবারই দশ/বিশ মিনিট করে অপেক্ষা করিয়েও আমি তাদের এখনো বাংলাদেশী টাইম শেখাতে পারলাম না।নির্দিষ্ট সময়ের দশ মিনিট আগে পৌছানোটাই জার্মান ফিলোসোফি।


জ্ঞান বিজ্ঞানের চর্চায় নিবেদিত উদ্ভাবনী এক জাতি জার্মানিকে বলা হয় ল্যান্ড অব আইডিয়াজ। জ্ঞান-বিজ্ঞানের চর্চায় সব সময় নিবেদিত এই দেশ তাই সবসময়ই থিংকার আর ফিলোসোফারদের দেশ বলে পরিচিত হয়ে এসেছে। আলবার্ট আইনস্টাইন, কার্ল মার্ক্স, মার্টিন লুথার কিংবা ফ্রেডরিখ নিৎশের মতো মহারথীরা যে এ দেশ থেকেই উঠে আসবে এটাই স্বাভাবিক। আমেরিকার পর বিশ্বের সবচেয়ে বেশি পিএইচডি স্কলারদের পাওয়া যাবে জার্মানিতেই। প্রতি বছর সবচেয়ে বেশি পেটেন্ট রেজিস্ট্রার করে ইউরোপের সবচেয়ে বেশি উদ্ভাবনী জাতি এই জার্মানরাই।


রুটির কত বাহার আটার রুটি, চালের রুটি আর পাউরুটি দেখে বড় হওয়ার পর জার্মান বেকারি শপে না ঢুকলে এ পৃথিবীতে যে আরো কতো রকম রুটি থাকতে পারে তা আমার অজানাই থেকে যেতো। রুটি বানানোটাকেও একটা শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া জার্মানদের আছে প্রায় তিনশ ভিন্ন রকমের রুটি। জার্মানির বিশেষ রকম রুটি প্রেতজেল মুখে না দিলে আপনি বঞ্চিত হবে জার্মানির ঐতিহ্যের স্বাদ নেওয়া থেকে। জার্মানির পোর্টসিটি হামবুর্গের ইংরেজি উচ্চারণ হ্যামবার্গ থেকেই জনপ্রিয় হ্যামবার্গারের উৎপত্তি বলে বহুল প্রচলিত মতামত আছে।


বিশ্বের সবচেয়ে বড় রেল কোম্পানি ডয়েচে বান সারা বিশ্বের দামী সব ব্র‍্যান্ডের গাড়ির দেশ হয়েও জার্মানিতে ট্রেনই সবচেয়ে জনপ্রিয় যানবাহন। সাবওয়ে উবান, ট্রামলাইন এসবান, দূরগামী আরই বা দ্রুতগামী আইসিই নিয়ে জার্মান রেললাইন এক নিরবিচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যাবস্থা। হোক বিশাল শহর অথবা প্রত্যন্ত গ্রাম,জার্মান ট্রেন আপনাকে পৌঁছে দিবে সবখানে। আমেরিকার মতো দেশে যেখানে প্রাইভেট কার না থাকলে আপনি যাতায়াতে প্রায়ই বিড়ম্বনায় পড়বেন সেখানে জার্মান রেল থাকতে প্রাইভেট কারের প্রাসঙ্গিকতা এখানে নিতান্তই নগন্য। এক ট্রেন থেকে নেমে আরেক ট্রেন পাওয়ার ক্ষেত্রে সময়ের সামঞ্জস্যতা আপনাকে মুগ্ধ করবে। জার্মান রেলের এই জনপ্রিয়তাই এর নিয়ন্ত্রক সংস্থা ডয়েচে বান তথা ডিবিকে পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম রেল কোম্পানিতে পরিণত করেছে। বছরে গড়ে দুইশ কোটি যাত্রী পরিবহন করে মোট আয়ের হিসাবে ২০১৫ সালে পৃথিবীর বৃহত্তম রেল কোম্পানির খেতাব পেয়েছিলো এই ডয়েচে বান।


পূর্ব আর পশ্চিমের ভিন্নতা ১৯৯০ সালে বার্লিন ওয়ালের পতনের মধ্য দিয়ে ইস্ট আর ওয়েস্ট জার্মানি এক হয়ে গেলেও প্রায় তিরিশ বছর পরো এখনো অনেক দিক থেকেই ভিন্ন রকম জার্মানির দুই অংশ। সবচেয়ে চোখে পড়ার মতো ভিন্নতা ধরা পরে দুই জার্মানির বিল্ডিং স্ট্রাকচারে। সোভিয়েত অধ্যুষিত অঞ্চল হওয়ায় সাবেক পূর্ব জার্মানির বিল্ডিংগুলো এখনো রাশিয়ান স্টাইলেরই একইরকম রিপিটিটিভ ডিজাইনেই আছে। অন্যদিকে সাবেক পশ্চিম জার্মানির বিল্ডিংগুলো স্বভাবতই ওয়েস্টার্ন ডিজাইনে করা।বার্লিনে গেলে আপনি ভালো করে লক্ষ্য করলে বিল্ডিং স্ট্রাকচার বা স্ট্রিটলাইট দেখে অবাক হয়ে অনুধাবন করতে পারবেন কিভাবে একই শহরের মধ্যে এখনো দুটি ভিন্ন দেশের অস্তিত্বের প্রমাণ বিরাজমান। পশ্চিমের তুলনায় কিছুটা আন্ডার ডেভেলপড পূর্ব জার্মানির মানুষদের দৃষ্টিভংগি আর আচার আচরণ এখনো অনেক অংশেই পশ্চিম জার্মানির মানুষদের থেকে আলাদা।


আহা, ডোনার কাবাব! জার্মানিতে আসলে আর কিছু না করলেও অন্ততঃ একটা ডোনার কাবাবের স্বাদ নিতে ভুলবেন না। পৃথিবীর অন্যতম সুস্বাদু এই স্ট্রিটফুড জার্মানি ছাড়া ইউরোপের অন্য কোনো দেশে সাধারণত পাবেন না। তুর্কী স্পেশালিটি এই কাবাবের আবিষ্কার আসলে জার্মানিতে বসবাস করা তুর্কীদের হাত ধরেই হয়েছিলো। জার্মানির প্রায় সর্বত্র পাওয়া যাওয়া স্বল্পমূল্যের একটি ডোনার কাবাব খেলে একবেলা আপনার আর অন্যকিছু না খেলেও চলবে। বিশাল আকারের বিশেষ ধরনের রুটির ভিতর গরু বা মুরগির মাংসের কাবাবের সাথে নানা রকম মসলা আর সালাদের কম্বিনেশনে কামড় বসিয়ে পরমসুখে চোখ বন্ধ করে আপনিও হয়তো আনমনে বলে উঠবেন- আই লাভ ইউ ডয়েচল্যান্ড!


(জার্মানি আর জার্মান জীবন নিয়ে লিখা শুরু করার আগে আমার ধারণাই ছিলো না যে এ লেখাটা এতো বড় হতে পারে। বিশাল এক রচনা লেখার পর এখন অনুভব করছি যে বিষয়গুলো বলতে চেয়েছিলাম তার বেশিরভাগই বলা হয়নি। আপাতত এই পর্যন্তই থাকুক। আবার লেখার অনুপ্রেরণা আর উদ্দীপনা পেলে জার্মান জীবনের বাকি বিষয়গুলো পরবর্তীতে আবার কখনো লিখবো বলে আশা করি।)


এই লেখা পড়ার পরে কোন প্রশ্ন থাকলে বা মতামত দিতে চাইলে অথবা কাউকে ট্যাগ করতে চাইলে আমাদের ফেইসবুক গ্রুপ থেকে করতে পারেন

Subscribe to Our Newsletter

© BESSiG. বিনা অনুমতিতে এই ওয়েবসাইটের কোনো কন্টেন্ট অন্য যেকোন ওয়েবসাইট বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।