জার্মানিতে ইন্টার্নশীপ এর সম্ভাবনা ও বিভিন্ন দিক


মূলত আমরা অনেকেই মনে করি জার্মানির কোম্পানিগুলোতে আমাদের ইন্টার্নশীপ অথবা ব্যাচেলর / মাস্টার্স থিসিস পাওয়া অনেক কঠিন। তবে আমাদের কল্পনা জগতে বিষয়টাকে যতই জটিল আকারে রূপদান করি না কেন বিষয়টা তত জটিল নয়। আবার বিষয়টা যে একেবারে সহজ ঠিক তাও নয়। একটি ভালো কোম্পানিতে ইন্টার্নশীপ পাবার জন্য ভালো একাডেমিক রেজাল্ট এর পাশাপাশি প্রয়োজন হয় অাত্নবিশ্বাস , গঠনমূলক পরিকল্পনা এবং এই দুইটা র সমন্বয়ে গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাবার আপ্রাণ প্রচেষ্টা। তবে বলে রাখা ভাল , একাডেমিক রেজাল্ট অনেক সময় সহনশীল ভাবে ও দেখা হয় , তার মানে আপনার একাডেমিক রেজাল্ট অনেক ভালো হতে হবে এমনটা নয় , জার্মান গ্রেিডং অনুযায়ী মোটামুটি ভালো রেজাল্ট হলেই যথেষ্ট। একটি ভাল কোম্পানিতে ইন্টার্নশীপ ভবিষ্যতে ভাল জব পাবার জন্য একটি গুরত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে। তাই এই বিষয়টা তে খুবই মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। যদি একটু গঠনমূলক ভাবে কাজ করে ভাল টফিক ও কোম্পানিতে ইন্টার্নশীপ করা যায় তবে মন্দ কি ? তাহলে আসুন আসল আলোচনায় আসা যাক।


পূর্ব শর্ত :


যে বিষয়টা সর্ব প্রথম খুবই গুরত্বপূর্ণ তা হলো আপনার ধৈর্যশীলতা । জার্মানি র কোম্পানিতে আপনি ২০ টি এপ্লিকেশন করার পর যদি ১৯ টিতেই প্রত্যাখ্যাত হন, তবে আপনাকে ধৈর্যের সাথে বাকি একটার জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এমনটা কখনই মনে করা যাবেনা যে আমাকে দিয়ে আর হবেনা অথবা আমার যোগ্যতা নেই। এখানে এটা খুবই স্বাভাবিক যে আপনি ৫০ টি এপ্লিকেশন করলে ২-৩ টি তে ইন্টারভিউ এর জন্য কল পাবেন। অবশ্য এই ধরনের প্রত্যাখ্যাত এর অনেক কারন থাকে যেটা আপনার যোগ্যতার সাথে সম্পর্কিত নয়, যেমন ইতিমধ্যে নিয়োগ হয়ে গেছে অথবা কোম্পানি এই পোস্ট এর জন্য আর এপ্লিকেশন নিবেনা ইত্যাদি। সুতরাং এই ধরনের পরিস্থিতিতে ভেঙ্গে পরার কোন কারন নেই , এটাই স্বাভাবিক।


আবেদন করার সময় :


ইন্টার্নশীপ এর এপ্লিকেশন করার ক্ষেত্রে এপ্লিকেশন করার সময় টা খুবই গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আপনি যেই সেমিষ্টার এ ইন্টার্নশীপ শুরু করতে আগ্রহী তার পূর্বের সেমিষ্টার এর প্রথম দিকেই এপ্লিকেশন শুরু করা উচিত।তার মানে নূন্যতম ০৪ মাস আগে এপ্লিকেশন শুরু করতে হবে এবং ইন্টার্নশীপ নিশ্চিত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ধারাবাহিক ভাবে এপ্লিকেশন চালিয়ে যেতে হবে। এক্ষেত্রে এমনটি করা যেতে পারে যে , আপনি সিদ্ধান্ত নেবার পর প্রতি সপ্তাহের নির্দিষ্ট একটি দিন বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে ৪-৫ টি এপ্লিকেশন করার পরিকল্পনা করতে পারেন। যদি কেও এমনটি মনে করে যে, ১-২ মাস আগে এপ্লিকেশন করে ইন্টার্নশীপ যোগাড় করে ফেলবে তাহলে ওই সেমিস্টার টি মিস করার ঝুঁকি থেকে যায় পাশাপাশি কোম্পানি পছন্দ করার ক্ষেত্রেও সীমাবদ্দতা এসে যায়। এমনকি কিছু কিছু কোম্পানি প্রায় ২-৩ মাস আগেই ইন্টার্নশীপ এর জন্য আবেদনকারীদেরকে নিশ্চিত করে, তাই ইন্টার্নশীপ যেহেতু করতেই হবে তাহলে একটু আগে থেকে প্রস্তুতি নিলে সবকিছুই সুন্দরভাবে করা সম্ভব। । সুতরাং প্রথম দিক থেকেই সময় অপচয় না করে সময় কে কাজে লাগাতে হবে।


কোম্পানি ও টফিক নির্বাচন :


এই বেপারে লেখার আগে প্রথমে ই একটু বলে নেই , স্বপ্ন যখন দেখবই তাহলে উত্তম স্বপ্নটা কেন নয়। এপ্লিকেশন করার সময় সর্বপ্রথম টার্গেট হওয়া উচিত ভালো ও আন্তর্জাতিক ভাবে পরিচিত কোম্পানি গুলো। যেহেতু এপ্লিকেশন করতে কোন টাকা খরচ হবেনা তাহলে ভালো কোম্পানিতে কেন নয় ? ১০ টি ভাল কোম্পানিতে আবেদন করলে যে কোনো একটিতে আল্লাহ চাইলে হয়ে যেতেই পারে। এই ক্ষেত্রে আপনার পড়াশুনার সাথে যেই যেই কোম্পানি গুলোতে ইন্টার্নশীপ অফার করে তাদের একটি লিস্ট তৈরী করা যেতে পারে এবং এমন ভাবে এপ্লিকেশন করতে হবে যাতে তাদের একটিও মিস না হয়। আমরা অনেক সময় হিনমন্যতায় ভোগী যে আমাদের কে দিয়ে এত ভালো কোম্পানিতে হবেনা , কিন্ত কেন ভুলে যাই আমাদের মত কোনো না কোনো স্টুডেন্ট ই একই পজিশনে-এ নিয়োগ পাচ্ছে। আপনারা জেনে খুশি হবেন আমাদের অনেক বাঙালি ভাই BMW,Continental, AUDI ,Siemens, ZF, Bosch, Roolls Royce এর মত কোম্পানিতে ইন্টার্নশীপ করেছেন, অনেকেই এখনো করতেছেন ,আবার তাদের মধ্যে অনেকেই এই ধরনের কোম্পানিগুলুতে জব করছেন।সুতরাং তারা পারলে আমিও কেন তাদের মত করার জন্য চেষ্টা করবোনা ?

টফিক এর ক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার আপনি যেই সাবজেক্ট এ পড়াশুনা করছেন আপনার ইন্টার্নশীপ ও যেন একই টফিকের হয় , যাতে করে ভবিষ্যৎতে এ জব পাবার পাশাপশি নিজের ফিল্ড এ কিছু প্রাকটিক্যাল অভিজ্ঞতা অর্জন করা যায়। পাশাপাশি পড়াশুনার সাথে যদি ইন্টার্নশীপ এর সাবজেক্ট মিলে থাকে তাহলে ইন্টার্নশীপ পাইতে ও অনেক সুবিধা হয়। এটা কখনই উচিত হবেনা যে আমি পড়াশুনা করছি এক সাবজেক্ট এ কিন্তু এপ্লিকেশন করছি অন্য সাবজেক্ট এ , এমনটা হলে নিজের ফিল্ড এ কিছু জানার পরিবর্তে সময়টাই নষ্ট হবে। তবে কারো যদি কোন ফিল্ড এ খুব আগ্রহ থাকে সেটা অন্য কথা। সুতরাং কোম্পানি ও টফিক নির্বাচন এর ক্ষেত্রে আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন।


কোথায় এবং কিভাবে আবেদন করতে হবে ?


মূলত অধিকাংশ কোম্পানিগুলোর নিজস্য ওয়েব সাইট এ ক্যারিয়ার নামক একটি পোর্টাল থাকে। আপনি যদি স্পেশাল কোন কোম্পানিতে আবেদন করতে চান তাহলে গুগল সার্চ এর মাধ্যমে কোম্পানীর অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বের করে পছন্দ মত টফিকের আবেদন করতে পারেন। সবচাইতে মজার বেপার হলো প্রায় ৯৯% কম্পানিতেই অনলাইন আবেদন করা যায় তাতে অনেক সময়ও বাঁচে। আবার অনেক কোম্পানিতে রেজিস্ট্রেশন করার একটি অপশন থাকে , এই ধরনের কম্পানিগলুতে একবার রেজিস্ট্রেশন করার মাধ্যমে পছন্দমত সবগুলো অপশনে আবেদন করা যায় , এক্ষেত্রে শুধু পজিশন অনুযায়ি মটিভেশনটি পরিবর্তন করতে হয়। কেও যদি পাশাপাশি অন্যান্য কোম্পানি তেও আবেদন করতে চান তাহলে stepstone, jobstairs ইত্যাদি সাইট গুলো ভিসিট করতে পারেন। এক্ষেত্রে অবশ্যই গুগল মামার সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।


জার্মান ভাষা সীমাবদ্ধতা ?


অনেকেই ভয় পেয়ে থাকেন জার্মান ভাষার সীমাবদ্দতার কারনে। আসলে এই বিষয়ে ভয় পাবার কারন নেই। যদি কোনো সাক্ষাৎকারের আমন্ত্রণ পাওয়া যায়। তাহলে দেখা যায় ইন্টারভিউ এর প্রথম দিকে পরিচিতি পর্ব থাকে প্রায় ৫-৭ মিনিট। আপনাকে এই সময় টাকে কাজে লাগাতে হবে। পরিচিতি পর্বে খুব সুন্দর ও মার্জিত ভাবে আপনার পরিচয় দিন। যদি এতেও সমস্যা হয় প্রয়োজনে ইন্টারভিউ তে যাবার আগে ভালোভাবে প্রস্তুতি নিয়ে যান অথবা নিজের পরিচিতি ভালোভাবে মুখস্ত করে যান। তারপর যখনি টেকনিকাল অথবা আপনার টফিকের এর দিকে যাবে তখন খুব মার্জিতভাবে বলতে পারেন যে , আমাকে যদি ইংলিশ এ ব্যাখ্যা করার সুযোগ দেন তাহলে আমি ভালো ব্যাখ্যা করতে পারবো। নিশ্চিত থাকুন প্রায় ৯০% সম্ভাবনা আছে আপনার ইন্টারভিউ ইংলিশ এ দেওয়ার সুযোগ পাওয়ার। অধিকাংশ কোম্পানি তেই যারা ভালো পজিশনে জব করেন তাদের অধিকাংশই ভালো ইংলিশ বলতে পারেন। এমনকি কখোনো কখনো কোন ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট দের দেখলে ওনারা নিজে থেকেই জিজ্ঞাসা করেন কোনটা ভালো হবে ইংলিশ অথবা জার্মান. আর ইংলিশ এ শুরু করার পর তো আপনি নিজেই ....!! . তবে মনে রাখতে হবে জার্মানীতে জব করতে হলে জার্মান ভাষার প্রয়োজনীতা অপরিহার্য , তাই কোন ক্রমেই জার্মান ভাষাকে অবহেলা করার কোনো সুযোগ নেই। যদি স্বাভাবিক কথা বার্তা গুলো জার্মান ভাষায় বলা যায় তবে এটা একটা ভালো সুযোগ করে সহকর্মীদের সাথে আন্তরিক হবার জন্য । সুতরাং জার্মান ভাষার ও কোনো বিকল্প নেই।


প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট :


মূলত এপ্লিকেশন করার জন্য CV, Motivation letter, Mark sheet, যদি পূর্বের কোন কাজের অভিজ্ঞতা থাকে তার সার্টিফিকেট ইত্যাদি প্রয়োজন হয় । এক্ষেত্রে অবস্যই কোম্পনীর requirements ভালোভাবে পরে নিতে হবে , যদি কোম্পানি অতিরিক্ত কোন ডকুমেন্টস চায় তবে তাও দিতে হবে। একটা বিষয় খুব ভালোভাবে মনে রাখতে হবে যে জার্মানি তে মূলত দুই ধরনের ইন্টার্নশীপ হয় ১. একাডেমিক বাধ্যতামূলক ২. একাডেমিক বাধ্যতামূলক নয়। এক্ষেত্রে যারা ব্যাচেলর স্টুডেন্টস তাদের জন্য বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশীপ , যারা মাস্টার্স এ পরেন তাদের অনেকের জন্য বাধ্যতামূলক আবার অনেকের জন্য নয় , এই বিষয়গুলো মূলত ভার্সিটি ও সাবজেক্ট এর উপর নির্ভর করে। আপনি যেই ধরনের ইন্টার্নশীপ ই করেন না কেন আপনার Motivation letter এ তা উল্লেখ করে দিতে হবে যে আপনি কোন ধরনের ইন্টার্নশীপ করতে চান। যদি একাডেমিক বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশীপ হয় তাহলে অনেক ক্ষেত্রেই কোম্পানি ইউনিভার্সিটি থেকে একটি সার্টিফিকেট দিতে বলে , এক্ষেত্রে ইউনিভার্সিটি র Student Service Department এ যোগাযোগ করুন। আপনার CV এবং Motivation letter জার্মান ভাষায় হওয়াটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।প্রয়োজনে আশেপাশের কোন জার্মান ফ্রেন্ড কে দিয়ে অনুবাদ করিয়ে নিন। মনে রাখতে হবে আপনি application করার পর কোম্পানি আপনাকে শুধু আপনার CV এবং Motivation letter দেখেই ইন্টারভিউ এর জন্য invite করবে, তাই CV এবং Motivation letter যত ভালো ও মার্জিত ভাবে উপস্থাপন করা যায়। Motivation letter এ আপনার অভিজ্ঞতা , দক্ষতা , আপনার টপিকস এ apply করার কারণ এবং এই position এর জন্য নিজেকে যথার্থ যোগ্য হিসাবে সুন্দর ও মার্জিত ভাবে বর্ণনা করুন । যদি কারো CV এবং Motivation letter এর format এর প্রয়োজন হয় তাহলে এই গ্রুপ এর অ্যাডমিন দের সাথে যোগাযোগ করুন , আশা করি ওনারা আপনাদের কে এই বিষয়ে সাহায্য করতে পারবেন। CV এবং Motivation letter এর বেপারে সর্বশেষ কথা হলো : এখানে আপনি আপনার নিজেকে যতটুকু সম্ভব সুন্দর ও পরিমার্জিত বর্ণনা করুন যাতে করে কোম্পানি এগুলো পরার পর আপনার প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করে। তবে অবস্যই অহেতুক বিষয় অথবা নিজে যা পারেন না সেই বিষয়ে লেখা থেকে বিরত থাকুন। পরবর্তিতে আপনি যদি কোম্পানি তে নির্বাচিত হন তাহলে কোম্পানি অন্যান্য ডকুমেন্টস গুলো চাইবে যেমন পাসপোর্ট , ওয়ার্ক পার্মিট ইত্যাদি।


সারমর্ম ও short টিপস :


১. পরিমার্জিত CV এবং Motivation letter তৈরী করুন।

২. নূন্যতম ০৪ মাস আগে থেকে application শুরু করুন।

৩. টপ লেভেল কোম্পানি গুলোর একটি লিস্ট তৈরী করুন এবং প্রত্যেকটি তে নূন্যতম ৫-৮ টি

application করুন.

৪. ইন্টারভিউ তে যাবার পূর্বেই নির্দিষ্ট টপিকস এর ওপরে নিজেকে প্রস্তুত করে নিন।

৫. অনেক rejection আসবে ধৈর্য হারানো যাবেনা।

----- যারা ইন্টার্নশীপ করছেন বা করবেন তাদের কাছে অনুরোধ থাকবে নিয়মনুবর্তিতা , সমযনূবর্তিতা ইত্যাদি বিষয়গুলো ভালোভাবে মান্য করুন। মনে রাখবেন আপনার বেক্তি উপস্থাপন এর মানেই হলো বাংলাদেশ কে উপস্থাপন। এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন যা আপনার ও দেশের প্রতি খারাপ দৃষ্টিভঙ্গি র সহায়ক হবে। মনে রাখবেন আপনার আচরণ এবং performance পরবর্তিতে অন্য আরেকজন বাংলাদেশী কে সহায়তা করবে।


------- যারা internship করছেন বা করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন সবার প্রতি শুভ কামনা এবং সফলতা কামনা করছি . আমার জন্য দোআ করতে ভুলবেন না যেন .....!!


ছবিঃ অনলাইন

©️এই লেখার মেধাস্বত্ব শুধুমাত্র লেখকের এর জন্য সংরক্ষিত।



Subscribe to Our Newsletter

© BESSiG. বিনা অনুমতিতে এই ওয়েবসাইটের কোনো কন্টেন্ট অন্য যেকোন ওয়েবসাইট বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।