জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য

লিখেছেন Shahab U Ahmed


জার্মানিও বিদেশী ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। বিশেষত অনার্স ও মাস্টার্স লেভেলে ইংরেজি ভাষায় প্রচুর সংখ্যক চাহিদা সম্পন্ন কোর্স চালু হওয়া, শিক্ষার উচ্চমান এবং বিনা টিউশন ফিতে পড়াশুনা করার সুবিধাই এর প্রধান কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। এছাড়া অর্থনৈতিক ভাবে দেশটির অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থান, সেনজেন ভিসা সহ অন্যান্য সুবিধাও এর অন্যতম কারণ। এর এসব কারণেই জার্মানিতে পড়াশুনা করতে আসা বাংলাদেশিদের সংখ্যাটাও দিনকে দিন বেড়েই চলছে।

বৃত্তির সুযোগ: স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়ে বিপুল সংখ্যক সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা বৃত্তি দিয়ে থাকে। এর মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো জার্মান সরকারের অধীন ডিএএডি (DAAD) স্কলারশিপ। এছাড়া রয়েছে ইরাসমুস, হাইনরিস বল, ডয়েচলান্ড স্টাইপেনডিয়াম, ক্যাথলিক একাডেমিক এক্সচেঞ্জ বৃত্তি সহ আরো কিছু সংস্থার বৃত্তি। বৃত্তির পরিমান সর্বনিম্ন ৩৫০ ইউরো থেকে সর্বোচ্চ ১৮০০ ইউরো পর্যন্ত হতে পারে।

জনপ্রিয় কিছু কোর্স: জার্মানিতে বর্তমানে ৪১৫ টিরও বেশি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি পর্যায়ে প্রায় ১৮০০ টি কোর্সে পড়ার সুযোগ আছে। এছাড়া দেশটিকে বলা হয় ইঞ্জিনিয়ারদের স্বর্গ। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমিক্যাল, মেকানিক্যাল, বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, কম্পিউটার সাইন্স, অটোমেশন সহ মলিকিউলার সায়েন্স, কেমিস্ট্রি, বায়ো-কেমিস্ট্রি, ফিজিক্স, পরিবেশ বিদ্যা, পানি-বিজ্ঞান, গণিত, ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস, ইকোনমিক্স, পলিটিকাল সায়েন্স, ইউরোপিয়ান স্টাডিস, আমেরিকান স্টাডিস, দর্শন বিদ্যা ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে পড়ার সুযোগ বিদ্যমান আছে।

স্নাতকে আগ্রহীদের জেনে রাখা ভালো: জার্মানিতে স্নাতক পর্যায়ের কোর্স সাধারনত ৩ বছর মেয়াদী। সরাসরি আবেদন করতে হলে সর্বমোট ১৩ বছরের শিক্ষাজীবন শেষ করার প্রমানপত্র থাকতে হবে। অর্থাৎ এস এস সি ও এইচ এস সি’ র পাশাপাশি বাংলাদেশের যেকোনো একটি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অন্তত ১ বছর পড়াশুনা শেষ করার সার্টিফিকেট থাকতে হবে। ইংরেজি ভাষার কোর্সের ক্ষেত্রে আই ই এল টি এস স্কোর কমপক্ষে ৬.০ থাকতে হবে।অন্যদিকে, জার্মান ভাষায় স্নাতকে পড়তে চাইলে ভাষাটিতে ভালো দক্ষতা থাকতে হবে এবং স্থানীয় স্টুডিয়েনকলেগ (Studienkolleg) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউনি এসিস্ট (বিদেশী শিক্ষার্থীদের ভর্তি আবেদন যাচাই-বাছাই করার জন্য জার্মান সরকার স্বীকৃত একটি সংস্থা) এর মাধ্যমে আবেদন করতে হয়। এক্ষেত্রে প্রথম আবেদনের জন্য ফি ৭৫ ইউরো এবং পরবর্তী প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের জন্য ফি ১৫ ইউরো।

স্নাতকোত্তরে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের যা জানা দরকার: মাস্টার্স কোর্সের ব্যাপ্তিকাল সাধারনত দুই বছর। তবে অল্প কিছু কোর্স আছে যেগুলুর সময়সীমা এক থেকে দেড় বছর। মাস্টার্সে ভর্তিচ্ছুদের অবশ্যই ইউ জি সি অনুমোদিত যেকোনো সরকারী কিংবা বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রীধারী হতে হবে । আই ই এল টি এস পরীক্ষার স্কোর অন্তত ৬. ০ অথবা টোফেল স্কোর ৫৫০ থাকাটা খুবই জরুরি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরাসরি জার্মানির যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদন করা যায়। তবে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্নাতকের মতোই ইউনি-এসিস্ট এর মাধ্যমে আবেদন করতে হয় । চাকুরী ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা, গবেষণা মূলক কাজ, জার্নাল-আর্টিকেল প্রকাশ ইত্যাদি ভর্তির ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে ।

পি এইচ ডি আগ্রহীদের দরকারী তথ্য: এক্ষেত্রে প্রার্থীকে অবশ্যই স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী হতে হবে। সাথে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত পাবলিকেশন, আর্টিকেল টনিকের মত কাজ করে। এছাড়া পিএইচডি পাবার ক্ষেত্রে ভালো মানের প্রপোজাল ও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকদের সাথে যোগাযোগ করেও খুব সহজে পিএইচডি করার সযোগ পেয়ে যেতে পারেন। জার্মানিতে সবচেয়ে জনপ্রিয় পিএইচডি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হলো ডিএএডি। এছাড়া অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে ফ্রনহফার ইনস্টিটিউট, হেলমল্ট্স এসোসিয়েশন, ম্যাক্স প্লাঙ্ক রিসার্চ ইনস্টিটিউট ইত্যাদি। অন্যদিকে পিএইচডি ফান্ডিং এর পরিমান মাসিক ১০০০ ইউরো থেকে শুরু করে ১৮০০ ইউরো পর্যন্ত। এছাড়াও রয়েছে অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা।

ভর্তি আবেদন যেভাবে শুরু করবেন: জার্মানিতে বছরে দুটি সেমিস্টার। একটি গ্রীষ্মকালীন (এপ্রিল-সেপ্টেম্বর) এবং অপরটি শীতকালীন (অক্টোবর-মার্চ)। প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন কোর্সে আবেদনের নির্দিষ্ট সময়সীমা বিভিন্ন রকম হতে পারে। আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় নথিপত্র, যেমনঃ মটিভেশন লেটার, রিকমেন্ডেশন লেটার, চাকুরীর অভিজ্ঞতা সনদ, ভাষাগত দক্ষতার সনদপত্র, একাডেমিক ট্রান্সক্রিপট, পাসপোর্ট সহ অন্যান্য কাগজপত্র অবশ্যই নোটারির মাধ্যমে সত্যায়িত করে নিতে হবে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত ওয়েবসাইটে গিয়ে খুব সহজেই ভর্তি ফর্ম পূরণ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আপলোড করে আবেদন করে ফেলা সম্ভব। অনলাইন আবেদনের শেষে সাধারনত কাগজপত্রগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিকানা বরাবর পাঠাতে হয়। আবেদনের সর্বশেষ সময়সীমা পার হওয়ার দুই মাসের মধ্যেই ভর্তির ব্যপারে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়া হয়।

ভিসা আবেদন পক্রিয়া: বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাপ্ত ভর্তিপত্র সহ ঢাকাস্থ জার্মান দুতাবাসের নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে গিয়ে আবেদন করে এপয়েন্টমেন্ট নিতে হয়। নির্দিষ্ট ফি পরিশোধ করে ভিসা সাক্ষাৎকারে অংশগ্রহন করতে হয়। জেনে রাখা ভালো, ভিসা সাক্ষাতের সময় জার্মানিতে আপনার বাসস্থানের প্রমানপত্র প্রদর্শন করতে হবে। জার্মানিতে প্রত্যেকের জন্যই স্বাস্থ্যবীমা থাকা অত্যাবশ্যক। ভিসা পাবার শর্ত হিসেবে ইন্টারভিউর আগেই স্বল্প মেয়াদী জার্মান স্বাস্থ্যবিমা করে নিতে হয়। বর্তমানে ভিসা পাবার অন্যতম পূর্বশর্ত হলো জার্মানির যেকোনো ব্যাংকে ব্লক একাউন্ট খোলা আর ব্লক অ্যাকাউন্ট হল এমন একটা ব্যাংক অ্যাকাউন্ট যাতে নির্দিষ্ট পরিমান টাকা রাখতে হবে যা চাইলেই এক সাথে তোলা যায়না। নতুন নিয়মে ব্লক হিসেবে ৮৬৪০ ইউরো এক বছরের জন্য নির্দিষ্ট করে রাখতে হবে, জার্মানিতে পড়াশুনা ও থাকার সক্ষমতা প্রমানের জন্য। গুরুত্বপূর্ণ এ সাক্ষাতকারে বিশ্ববিদ্যালয়, কোর্স কারিকুলাম, বিশ্ববিদ্যালয় যে শহরে অবস্থিত সে সম্পর্কিত তথ্য, ভবিষ্যত পরিকল্পনাসহ আরো অনেক প্রাসঙ্গিক বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়। সাক্ষাৎকার শেষ হবার সর্বোচ্চ ৩ মাসের মধ্যে ভিসা পাওয়া-না পাওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেয়া হয়।

খন্ডকালীন ও পূর্ণকালীন চাকুরী: উন্নত দেশ হওয়াতে জার্মানিতে খণ্ডকালীন জব খুব সহজেই পাওয়া যায় তবে পূর্ব-শর্ত হল জার্মান ভাষা জানা। উল্লেক্ষ্য যে, বিদেশী শিক্ষার্থীরা সপ্তাহে সর্বোচ্চ ২০ ঘন্টা কাজ করতে পারে। স্নাতক কিংবা স্নাতকোত্তর শেষে বিভিন্ন স্থানীয় ও বহুজাতিক কোম্পানিতে পূর্ণকালীন চাকুরী পাবার সম্ভাবনা ড়োয়েছে। তবে এক্ষেত্রে জার্মান ভাষা (কমপক্ষে বি-১ লেভেল) জানা থাকলে চাকুরী পাওয়া আরো সহজতর হয়।

স্থায়ী ভাবে বসবাসের সুবর্ণ সুযোগ: জার্মানিতে অন্তত ৫ বছর বৈধভাবে থাকলে ও সাথে পড়াশুনা শেষ করতে পারলে দক্ষ অভিবাসী হিসেবে যেকোনো শিক্ষার্থী স্থায়ীভাবে থাকার আবেদন করতে পারবেন। তবে এক্ষেত্রে ভাষাগত দক্ষতাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে পূর্ণকালীন জব হয়ে গেলে অথবা পিএইচডি সম্পন্ন করতে পারলে সর্বোচ্চ আট বছরের মধ্যেই স্থায়ী বসবাসের অনুমতি পাওয়া যায়।

প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে: জার্মানির উচ্চশিক্ষা ভিসা সংক্রান্ত অন্যান্য তথ্য পেতে প্রয়োজনীয় কয়েকটি ওয়েবসাইটে হলোঃ https://www.daad.de/en/, https://dhaka.diplo.de/



এই লেখা পড়ার পরে কোন প্রশ্ন থাকলে বা মতামত দিতে চাইলে অথবা কাউকে ট্যাগ করতে চাইলে আমাদের ফেইসবুক গ্রুপ থেকে করতে পারেন

Subscribe to Our Newsletter

© BESSiG. বিনা অনুমতিতে এই ওয়েবসাইটের কোনো কন্টেন্ট অন্য যেকোন ওয়েবসাইট বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।