জার্মানিতে কিভাবে ড্রাইভিং লাইসেন্স করা যায়



আমার ডিক্শনারিতে পরীক্ষায় ফেল বলে শব্দটা ছিল না, কিন্তু জার্মান ড্রাইভিং টেস্ট সেই শব্দটা যোগ করে দিয়েছে। আমার দেওয়া সবচে কঠিন পরীক্ষার মধ্যে ছিল জার্মান ড্রাইভিং টেস্ট। এই প্রথম, পরীক্ষা দিতে গিয়া আমার হাত পা কাঁপছে, কলিজার পানি শুকাইয়া গেছে। কারণ এইখানে ভুলের কোনো সুযোগ নাই, প্রতিটা সেকেন্ড গুরুত্বপূর্ণ।

এক্সজামিনার আপনাকে পাস দেওয়ার আগে খুব ভালো করে যাচাই করে নেয়। কারণ তারা খুব ভালো করে জানে আপনার হাতে ড্রাইভিং লাইসেন্স তুলে দেওয়া মানে একটা AK47 রাইফেল তুলে দেওয়া। তাই দেয়ার আগে ভালো করে বুঝে নেয়, আপনি এটা পাবার কতটা যোগ্য। এটা বাংলাদেশের মত না, যে ওস্তাদ ডাইনে প্লাষ্টিক বলে গাড়ি ভাগাইলেন। এইখানে আপনাকে প্রত্যেকটা নিয়ম মেনে, রিয়েল ট্রাফিক এর মধ্যে ৪৫ মিনিট গাড়ি চালিয়ে পাস করতে হবে। বা এটা ফ্রান্সের মত না, যে কোনো রকম গাড়ি চালাতে পারেন, ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়ে গেলেন, তারপর ১ বছর পিছনে বড় করে R লিখে যাকে খুশি তাকে ঠুঁকে দিতে পারেন। বা এটা পর্তুগালও না, যে ১০০০ ইউরো খরচ করে ২ নাম্বারি করে ড্রাইভিং লাইসেন্স নিয়া নিলেন।

আমার জানামতে জার্মানি হচ্ছে একমাত্র দেশ যেখানকার অটোভান (হাইওয়ে) তে আনলিমিটেড স্পিড এ গাড়ি চালাতে পারবেন। যেখানে ফ্রান্স, বেলজিয়াম এর সর্বোচ্চ গতিসীমা ১২০ কিমি/ঘন্টা। আর লোকজন গাড়ি চালায়ও অনেক গতিতে। কিন্তু তারপরও জার্মানির এক্সিডেন্ট রেকর্ড খুবই কম। তাই কারো কাছে যদি জার্মান ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকে, তাহলে ধরে নিতে পারেন, সে সত্যি সত্যি ড্রাইভিং জানে এবং সকল প্রকার নিয়ম কানুন মেনে গাড়ি চালায়।

আমার এই এতগুলো কথা বলার মূল উদ্দেশই হচ্ছে, আপনি যদি ড্রাইভিং লাইসেন্স করার প্ল্যান করে থাকেন তাহলে বেপারটা অনেক সিরিয়াসলি নেন। তা না হলে আপনাকে শুধু শুধু সময় ও ইউরো দুটোই নষ্ট করতে হবে।

আপনার কাছে যদি বাংলাদেশের অথবা অন্য যেকোন দেশের ড্রাইভিং লাইসেন্স থেকে থাকে তাহলে আপনি আপনার ড্রাইভিং লাইসেন্সকে জার্মান ড্রাইভিং লাইসেন্স এ ট্রান্সফার করতে পারবেন। তবে সে ক্ষেত্রেও আপনাকে সকল প্রসেস ফলো করে ড্রাইভিং টেস্ট দিয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স নিতে হবে, কাগজ দিলেন আর পেয়ে গেলেন তেমন কিছু না। আপনাকেও নতুন ড্রাইভিং লাইসেন্স করার মত সকল প্রসেসকে ফলো করতে হবে। তবে আপনি যদি ড্রাইভিং লাইসেন্স কনভার্ট করেন সে ক্ষেত্রে আপনি ২টি সুবিধা পাবেন:- ১) আপনি ১৬টি বিশেষ ড্রাইভিং ক্লাসের টাকা (৮০০-১২০০ ইউরো) সেভ করতে পারবেন, ২) গাড়ির ইন্সুরেন্স পেমেন্ট এর ক্ষেত্রে একটা ভালো সুবিধা করতে পারবেন। আমার জানামতে আপনার লাইসেন্স যে দেশেরই হউক না কেন আপনি সর্বোচ্চ ৬ মাস সেই লাইসেন্স দিয়ে জার্মানিতে গাড়ি চালাতে পারবেন। তবে বাংলাদেশের লাইসেন্স দিয়ে থিওরিটিকেলি পসিবল হলেও প্রেক্টিকেলি পসিবল না, মোট কথা বাংলাদেশের ড্রাইভিং লাইসেন্স দিয়ে আপনি একদিনও গাড়ি চালাতে পারবেন না।

এখন আসেন ড্রাইভিং লাইসেন্স করার ধাপ গুলো জেনে নেই:

১) এই ধাপটি শুধুমাত্র যারা কনভার্ট করতে চান, তাদের জন্য। বাকি ধাপগুলো সবার ক্ষেত্রে এক। এক্ষেত্রে আপনাকে প্রথমে যেতে হবে ADAC, সেখানে গিয়ে আপনি আপনার ড্রাইভিং লাইসেন্স দিলে তারা আপনাকে জার্মান ইকুভ্যালেন্ট একটা ট্রান্সলেশন সার্টিফিকেট দিবে। আর এর জন্য আপনাকে খুব সম্ভবত ১২০-১৫০ ইউরো পেমেন্ট করতে হবে।

২) এরপর চলে যান ড্রাইভিং স্কুল। তবে ড্রাইভিং স্কুল যাবার আগে আপনি নিজে নিজে ২ টি কাজ সেরে নিতে পারেন, ১) ফার্স্টএইড ট্রেনিং ও ২) আই টেস্ট। এই ২ টি প্রসেসের জন্য আপনার ২৫-৩০ ইউরো লাগতে পারে। তবে আমার সাজেশন থাকবে আগে ড্রাইভিং স্কুল যান, কারণ অনেক স্কুল থেকে আপনি এই ২ টি পেপারের জন্য বিশেষ অফার পেয়ে থাকবেন।

৩) এরপর একটি ড্রাইভিং স্কুলএর সাথে স্টুডেন্ট হিসাবে রেজিস্ট্রেশন করুন, তবে রেজিস্ট্রেশন করার আগে ৩/৪ টি স্কুল এ খোঁজ নিন। তাদের প্রাইস সম্পর্কে জানুন, তারপর আপনার সুবিধা মত একটা স্কুল এ রেজিস্ট্রেশন করুন। ড্রাইভিং স্কুল এর চার্জগুলো নিচে দেওয়া হলো:

ক: স্টুডেন্ট রেজিস্ট্রেশন ফী(এককালীন সর্বোচ্চ ১ বছরের জন্য) ১০০-১৫০ ইউরো

খ: ড্রাইভিং লার্নিং প্রতি ঘন্টা ফি(৪৫ মি = ১ ঘন্টা) ৪০-৫০ইউরো

গ: বিশেষ ড্রাইভিং লার্নিং প্রতি ঘন্টা ফি(৪৫ মি = ১ ঘন্টা) ৫০-৬০ ইউরো (যারা কনভার্ট করবেন তাদের দরকার নাই, এটা শুধু নতুন লাইসেন্স করার জন্য লাগে এবং ১৬ ঘন্টা বাধ্যতামূলক, যার মধ্যে ৮ ঘন্টা অটোভানে ও ৮ ঘন্টা নাইট ড্রাইভিং)।

ঘ: প্র্যাকটিকেল পরীক্ষার জন্য বিশেষ ড্রাইভিং ঘন্টা ফি ১২৫-১৭৫ ইউরো

৪) এরপর আপনি চলে যান সিটি রেজিস্ট্রেশন অফিস, সাথে নিয়া যান

৪-১) ADAC থেকে পাওয়া ট্রান্সলেশন সার্টিফিকেট ও বর্তমান ড্রাইভিং লাইসেন্স

৪-২) পাসপোর্ট

৪-৩) আউসভাইস

৪-৪) এক কপি লেটেস্ট ছবি

৪-৫) ড্রাইভিং স্কুল রেসিজিট্রেশন পেপার

৪-৬) ফার্স্টএইড ট্রেনিং সার্টিফিকেট

৪-৭) আই টেস্ট সার্টিফিকেট

৪-৮) আর লাগবে হয়তো ৫০ ইউরো এর মত, কিন্তু কত আমার ঠিক মনে নাই।

৫) এরপর স্কুলএ থিওরি ক্লাস করেন ও একটা সফটওয়্যার কিনে নেন (৫০ ইউরো হবে)। এই সফটওয়্যার দিয়ে আপনি থিওরি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নেন। সিটিতে রেজিস্ট্রেশন করার পরে ২-৪ সপ্তাহের মত সময় লাগে পরীক্ষা দেয়ার পেপার আসতে।

৬) আপনার বাসায় চিঠি আসবে থিওরি ও প্রেক্টিকেল পরীক্ষার জন্য। থিওরি পরীক্ষার ফি ২৫ ইউরো ও প্রেক্টিকেল পরীক্ষার ফি ৯৭ইউরো। আপনি চাইলে ব্যাঙ্ক ট্রান্সফার করতে পারেন, কিন্তু আমি সাজেস্ট করবো টাকাটা ক্যাশ পেমেন্ট করতে। আপনার থিওরি প্রস্তুতি হলে সরাসরি চলে যান TÜV এক্সাম সেন্টার, ক্যাশ পেমেন্ট করে সাথে সাথে বসে যান থিওরি পরীক্ষায়। পাস হলে সাথে সাথে আপনি পাবেন পাসিং সার্টিফিকেট, আর ফেইল করলে পাবেন ফেইল সার্টিফিকেট। একবার ফেইল করলে আপনাকে আবার ২ সপ্তাহের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। ২ সপ্তাহ পরে আপনি আবার এক্সাম দিতে পারবেন। এইভাবে যতদিন পর্যন্ত আপনি পাস না করবেন, ততদিন আপনাকে এক্সাম দিয়ে যেতে হবে।

৭) থিওরি পরীক্ষায় পাস করার পর আপনি যদি প্রেক্টিকেল পরীক্ষার জন্য প্রস্তুত হন, তখন আপনার স্কুল আপনার জন্য প্রেক্টিকেল পরীক্ষার সময় বুক করবে। এই সময়ের মধ্যে আপনি TÜV এ ৯৭ইউরো ক্যাশ জমা দিয়ে দিতে পারেন। প্রেক্টিকেল পরীক্ষায় পাস করলে এক্সামিনার আপনার হাতে সাথে সাথে ড্রাইভিং লাইসেন্স দিয়ে দিবে, যদি ফেল করেন তাহলে একটি পেপার দিবে, যেখানে লিখা থাকবে আপনি কয়টি ভুল এবং কতবার করেছেন। আর প্রেক্টিকেল পরীক্ষা চলাকালীন আপনার পাশের সিট এ থাকবে আপনার ইন্সট্রাক্টর, আপনি যদি পরীক্ষা চলাকালীন বড় কোনো ধরণের ভুল করতে যান তখন সাথে সাথে ইন্সট্রাক্টর গাড়ির কন্ট্রোল নিয়ে নিবে। গাড়ির কন্ট্রোল নেয়ার সাথে সাথে বেজে উঠবে হুইসেল, আর সে খানেই আপনার পরীক্ষা শেষ। আর সেটা যেকোনো সময় হতে পারে। এইভাবে আপনি যতবার ফেল করবেন ততবার ২ সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে। থিওরি এক্সাম পাস করার ১ বছরের মধ্যে আপনাকে প্রেক্টিকেল এক্সাম পাস করতে হবে। যদি সেটা সম্ভব না হয়, তাহলে আপনাকে আবার ৪ নম্বর ধাপ থেকে শুরু করতে হবে।

আসা করছি আমার এই পোস্টটি জার্মান ড্রাইভিং লাইসেন্সএর বেপারে আপনাদের সামান্য কিছু হলেও ধারণা দিবে। আমি পরবর্তীতে আরো একটি পোস্ট করবো, যেখানে আমি বলে দিবো সহজে ড্রাইভিং লাইসেন্স পাবার গোপন ফর্মুলা।


এই লেখা পড়ার পরে কোন প্রশ্ন থাকলে বা মতামত দিতে চাইলে অথবা কাউকে ট্যাগ করতে চাইলে আমাদের ফেইসবুক গ্রুপ থেকে করতে পারেন।

লেখক Pijush Sarkar

Senior Consultant

EXXETA AG, Germany

Subscribe to Our Newsletter

© BESSiG. বিনা অনুমতিতে এই ওয়েবসাইটের কোনো কন্টেন্ট অন্য যেকোন ওয়েবসাইট বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।