জার্মান ভাষা বিড়ম্বনা, ঘুম ও ট্রেনঃ

জার্মানিতে যারা আসে তাঁদের কাছে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জার্মান ভাষা বুঝতে পারা। যারা জার্মান ভাষা কি সেটাই জানেনা তাঁরা প্রথম প্রথম বিপদে পড়বেই গ্যারান্টি। আমিও সেই মূর্খদের মধ্যে একজন (৯০% আমার দলে) । আমার বাসা (Düsseldorf) থেকে আমার বিশ্ববিদ্যালয় (Kleve) প্রায় ৯৫ কিলোমিটার। ট্রেনে যেতে সময় লাগে ১ ঘণ্টা ২০ মিনিট । যাতায়াত খরচ ফ্রি, তা না হলে প্রতিদিন বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া আসাতে বাংলাদেশী টাকায় ৩ হাজার ৫০০ টাকা লাগত। প্রথমদিন আমার বাসার এক ভাইয়ের সাথে গিয়েছিলাম আমার ভার্সিটিতে। এরপর থেকে স্বাভাবিক ভাবেই একা একা যেতে হয়েছে। প্রথম ৪ দিন কোনো সমস্যা ছাড়াই যাওয়া আসা করেছি। ৫ম দিনে আসে জার্মান ভাষা না জানার মজা টের পেয়েছি। আমাদের ট্রেনের মূলত ২টা বগি। প্রতিটা বগিতেই ইঞ্জিন আছে। মাঝে মাঝে শুধু এক বগি দিয়েই কাজ সেরে ফেলা হয়। সেদিন ভার্সিটি থেকে বাসায় ফিরার সময় ট্রেনে উঠলাম। ট্রেনের সামনের দিকে এবং দরজার সামনে ডিজিটাল স্ক্রিন আছে, ওখানে লিখা থাকে ট্রেনের নাম্বার এবং সেটা কোথায় যাবে সেই শহরের নাম। আমি এত কিছু লক্ষ্য করতামনা কারণ ওখানে কি লিখা সেটা আমার কাছে জরুরী না বা আমি এমনিতেও বুঝতামনা কি লিখে রেখেছে। শুধু জানি এই ট্রেনটা আমার বাসা থেকে ভার্সিটি পর্যন্তই যাওয়া আসা করে। সেদিন লিখা ছিল nicht einsteigen। আমি সেদিকে লক্ষ্য না করে ট্রেনে উঠে বসে থাকি। নির্দিষ্ট সময় হওয়ার পর দেখি আমার বগি দাড়িয়ে, সামনের বগি স্টেশন ছেড়ে চলে যাচ্ছে। দ্রুত গুগল ট্রান্সলেটর দিয়ে ট্রান্সলেট করে দেখি ঐটার অর্থ Do not enter। অন্য আরেকদিন বাসা থেকে ভার্সিটিতে যাচ্ছি। অর্ধেক রাস্তায় যাওয়ার পর স্পীকারে কি যেন বলা হচ্ছে। আমি কিছুই বুঝিনা, শুধু বুঝতে পারছিলাম জরুরী কোনো ঘোষণা। তবে এমন ঘোষণা প্রায় সময় দেয়। যেমন ট্রেন যদি ছাড়তে ২/৩ মিনিট লেট হয় তাহলে স্পীকারে বলে দেওয়া হয়। আমার কাছে সব ঘোষণা একই রকম লাগত। তো ঐদিন এমনি কোনো ঘোষণা দেওয়ার পর সবাই ট্রেন থেকে নেমে পড়ল। আমি বুঝতে পারছিলামনা উনারা কি উনাদের গন্তব্যে চলে আসছে বলে নামছে নাকি নেমে যাওয়ার জন্য বলা হচ্ছে। আমি বসে রইলাম। সবাই নেমে যাওয়ার পর ট্রেন থেকে আবার কি যেন বলা হচ্ছে। আমি ভাবলাম ট্রেন বুঝি ছাড়তে একটু লেট হবে তাই বলছে। পরে দেখি একটু ধমক দিয়ে বলছে। উপরে তাকিয়ে দেখি সিসি ক্যামেরা। কিছুটা বুঝতে পারলাম আমাকে কিছু বলছে। আমি সিসি ক্যামেরার দিকে হা করি তাকিয়ে রইলাম। বেচারা ড্রাইভার ইঞ্জিন রুম থেকে বের হয়ে আমার কাছে এসে কিছু একটা বলছে। বুঝলাম নেমে যেতে বলছে। নেমে গেলাম। সমস্যা হচ্ছে ওরা ইংলিশ পারলেও ইংলিশে কথা বলতে চায়না। যাহোক, ট্রেন দেখি পিছনের দিকে ব্যাক করে চলে যাচ্ছে, পরের ট্রেনে করে ভার্সিটিতে গেলাম। কিছুদিন পর ঠিক এমন এক বিপদ। ঐদিন আমি ট্রেনে একা, পুরো বগিতে আর কেউ নাই। মাঝ রাস্তায় যাওয়ার পর ড্রাইভার স্পীকারে কি যেন বলছে। আমি ভাবলাম হয়ত নেমে যাওয়ার কথা বলছে। আমি নেমে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর দেখি ট্রেন ঠিক পথেই যাচ্ছে। বুঝতে পারলাম ট্রেন ছাড়তে ২-১ মিনিট লেট হবে সেটাই বলেছিল। কি আর করা, ৩০ মিনিট শুধু শুধু পরের ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করতে হল। আমি প্রতিদিন ট্রেনে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে যাওয়া আসা করি। তবে যেদিন ফোনে কথা বলি বা চ্যাট করি সেদিন বাদে। সকালে বিছানা থেকে উঠে শার্ট পেন্ট পড়েই এক দৌড়ে ট্রেনে চলে যায়। ব্রাশ আর টুটপেস্ট সবসময় ব্যাগে থাকে। ভার্সিটিতে গিয়ে ব্রাশ করি। কারণ বেশীরভাগ ক্ষেত্রে শেষ মুহূর্তে গিয়ে ট্রেনে উঠি। ট্রেনে উঠে যাওয়ার পর একটা টেক্সট করেই ঘুম। এক ঘুমে চলে যায় ভার্সিটিতে আবার আসার সময় এক ঘুমে বাসায়। কিছুদিন আগেও অভ্যাস মোতাবেক ট্রেনে উঠেই ঘুম দিলাম। আমি কখনো উল্টো দিকে বসতে পারিনা। কেমন যেন মাথা ব্যথা হয়। তো সেদিন ঘুম ভাঙ্গার পর দেখি আমি উল্টো দিকে যাচ্ছি। প্রথম মনে করেছি হয়ত ঘুম থেকে উঠার কারণে এমন মনে হচ্ছে। পরে ভাল করে লক্ষ্য করে দেখি আমি সত্যি সত্যি উল্টো দিকে যাচ্ছি। বুঝতে পারলাম সঠিক সময়ে আমার ঘুম ভাঙ্গেনি।

লেখকঃ জামান

Subscribe to Our Newsletter

© BESSiG. বিনা অনুমতিতে এই ওয়েবসাইটের কোনো কন্টেন্ট অন্য যেকোন ওয়েবসাইট বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।