ফ্যামিলি রি-ইউনিয়ন (দ্বিতীয় পর্ব)



স্টুডেন্ট অবস্থায় নিজের স্বামী/স্ত্রীকে জার্মানিতে ফ্যামিলি রি-ইউনিয়ন ভিসায় আনার জন্যে প্রাথমিক কাজ নিয়ে আলোচনা করার চেষ্টা করেছিলাম প্রথম পর্বে। আজ চেষ্টা করবো পরবর্তী কাজগুলো নিয়ে বলার। শুরু করা যাক চেকলিস্ট দিয়ে।

চেকলিস্ট আপনারা এই লিংকে গিয়ে ডাউনলোড করে নিতে পারবেন। [https://dhaka.diplo.de/blob/2076250/e9d8da5425eab89eedf7dbf87e811b47/fz-data.pdf]


প্রথমেই একটু বলে রাখা ভালো যে, আমার লেখায় 'স্পাউস' শব্দটি যিনি জার্মানিতে আসতে চান তাঁর জন্যে ব্যবহৃত হবে। প্রথম পয়েন্ট থেকেই শুরু করা যাক- - Valid Passport: এখানে আপনার স্পাউসের পাসপোর্ট বোঝানো হয়েছে। এক্ষেত্রে আপনার এম্বাসি ডেট যেদিন থাকবে, সেদিন থেকে পাসপোর্টের ন্যুনতম ১ বছর মেয়াদ থাকতে হবে। - 3 Recent Biometrical Passport Photographs: আপনার স্পাউসের সদ্য তোলা ৩ কপি পাসপোর্ট সাইজের বায়োমেট্রিক ছবি। 'বায়োমেট্রিক' শব্দটি নিয়ে বেশি মাথা ঘামানোর দরকার নেই। লক্ষ্য রাখবেন, ৪৫mmx৩৫mm সাইজে ছবি তুলবেন। পেছনের ব্যাকগ্রাউন্ড ধূসর রাখার চেষ্টা করবেন। ছবির বেশিরভাগ জায়গা জুড়ে যাতে মাথা দেখা যায়। (৪৫mm এর মধ্যে মাথা ৩২-৩৬mm এ রাখা ভালো। German Passport and Visa Photos লিখে google করলে নমুনা-ছবি পেয়ে যাবেন) **যারা হিজাব পড়েন, অবশ্যই খেয়াল রাখবেন যাতে আপনাদের কান, হেয়ার লাইন ও গলার কিছু অংশ দেখা যায়। - 2 Visa Application Forms: অনলাইনে বা অফলাইনে ফ্যামিলি রি-ইউনিয়নের অ্যাপ্লিকেশন ফর্ম পূরণ করবেন। এবং এর দুটি সেট করবেন। এক্ষেত্রে প্রতিটি পয়েন্ট ঠিকভাবে পূরণ করাটা গুরুত্বপূর্ণ। - Signed Declaration on True and Complete Information: আপনার সরবরাহকৃত তথ্যগুলো পূর্ণাঙ্গ এবং সত্য বলে আপনি স্বীকৃতি প্রদান করে একটি পেপারে সাইন করতে হবে, যাকে Signed declaration বলা হচ্ছে। এম্বাসিতেও পেপারটি দিয়ে থাকে। তবে ঝামেলা কমানোর জন্য নিজেই 'সাইন' করে নিয়ে যাওয়া ভালো। ফর্মটি পাবেন এই লিংকে- [https://dhaka.diplo.de/blob/2157316/34924dbefb3d20b70937b207f829bb27/declaration-of-consent-data.pdf] - Birth Certificate: আপনার স্পাউস এবং আপনার সন্তান থাকলে, তাদের জন্ম সনদের প্রয়োজন হবে। এক্ষেত্রে জন্ম সনদ ইংরেজীতে করাবেন এবং অনলাইনে করিয়ে রাখবেন মনে করে। চেষ্টা করবেন আপনার বর্তমান ঠিকানার কাউন্সিলর অফিস থেকে করানোর। **Birth Certificate অবশ্যই A4 সাইজের কাগজে ফটোকপি করাবেন। - Marriage Certificate/ Nikah Nama: সকল ধর্মের অনুসারীদের জন্যই বিবাহের সনদ প্রয়োজন হবে। ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের জন্য 'নিকাহ নামা' ও প্রয়োজন হবে। ম্যারিজ সার্টিফিকেট শুধু ইংরেজীতে হলেই চলবে। আর নিকাহ নামা বাংলা ও ইংরেজীতে উভয় ভাষাতেই প্রয়োজন হবে। ** চেষ্টা করবেন কন্যার বর্তমান ঠিকানার স্থানীয় কাজী অফিসে বিয়ে রেজিস্ট্রি করাতে। এই ব্যাপারটি নিয়ে অনেকের সাথেই অ্যাম্বাসিতে ঝামেলা করে। - Certificate of German Proficiency: Goethe Institute থেকে A1 কোর্স পাস করার অফিশিয়াল সার্টিফিকেট প্রয়োজন হবে। পরীক্ষার জন্য বছরে তিন থেকে চারটি ডেট দেয়া হয়। কোর্স যেখান থেকেই করুন সমস্যা নেই। - Copy of your Passport's Data Page: আপনার স্পাউসের পাসপোর্টের ডাটা পেইজের ফটোকপি লাগবে A4 সাইজে। **ডাটা পেজ- আমরা জানি পাসপোর্টের পাশাপাশি দুটি পৃষ্ঠার একটিতে ছবিসহ কিছু তথ্য এবং আরেকটিতে বাবা-মায়ের নাম সহ আরও কিছু তথ্য থাকে। এই দুটি পৃষ্ঠা একসাথে বইয়ের পাশাপাশি দুটি পৃষ্ঠা ফটোকপি করার মতো করে ফটোকপি করবেন। - Registration Certificate: জার্মানিতে যিনি অবস্থানরত, তাঁর City Registration Paper (Meldebescheinigung) অর্থাৎ Anmeldung Paper লাগবে। - Copy of German Residence Permit: জার্মানিতে যিনি অবস্থান করছেন, তাঁর German Residence Permit এর ফটোকপি লাগবে। এক্ষেত্রে উভয় পিঠকে একটি পৃষ্ঠায় কপি করাবেন। - Lease Agreement: জার্মানিতে আপনার স্পাউস আসার পর দুজন একসাথে যে স্থানে থাকবেন, সে স্থানের House-Contract লাগবে এবং এর ফটোকপি জমা দিতে হবে যত পৃষ্টা-ই হোক। এক্ষেত্রে আউসল্যান্ডার-বিহোর্ডেতে খবর নিবেন কত স্কয়ার-মিটারের বাসা লাগবে। সাধারণ নিয়ম হলো দুজনের জন্য ২৪ স্কয়ার মিটার প্রয়োজন। কিন্তু অনেক সিটিতে এর বেশিও চায়। ** আপনি ডর্মে থাকলেও সমস্যা নেই। - Copy of the Valid Employment Contract...: জার্মানিতে যিনি অবস্থান করছেন, তাঁর চাকরির কন্ট্রাক্ট পেপারের ফটোকপি লাগবে। যত পৃষ্ঠাই হোক না কেন। সাথে আপনার স্পাউসের যদি ব্লক একাউন্ট প্রয়াজন হয়, সেক্ষেত্রে জার্মানিতে আপনার একাউন্টে ব্লকের সমপরিমান বা তার চেয়ে বেশি এমাউন্টের স্টেইটমেন্ট দেখাতে হবে। এটিরও ফটোকপি লাগবে। - Photocopy of all pages....: যিনি জার্মানিতে অবস্থান করছেন, তাঁর সম্পূর্ণ পাসপোর্টের ফটোকপি লাগবে। **পাশাপাশি দুটি পৃষ্ঠা একটি পৃষ্ঠায় ফটোকপি করতে পারবেন। - Individual Sketch Maps: আপনার স্পাউসের বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানার আলাদা আলাদা স্কেচ ম্যাপ, আপনার (জার্মানিতে যিনি অবস্থান করছেন) বাংলাদেশে বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানার আলাদা আলাদা স্কেচ ম্যাপ এবং কাজী অফিসের স্কেচ ম্যাপ (ম্যারিজ সার্টিফিকেটে কাজী অফিসের যে ঠিকানা দেয়া আছে)। **স্কেচ ম্যাপের উপরে স্পেসিফিক লিখে দিবেন কার এবং কিসের স্কেচ ম্যাপ। যেমন আপনার স্পাউসের হলে লিখবেন 'Present Address of Applicant'। যিনি জার্মানিতে অবস্থান করছেন, তাঁর হলে লিখবেন, 'Present Address of X (Applicant's spouse)' **স্কেচের একপাশে একজনের নামসহ ফোন নাম্বার দিয়ে দিবেন। ব্র্যাকেটে পরিচয় লিখে দিতে পারেন। যেমন আপনার বর্তমান ঠিকানায় দিতে পারেন আপনার বাবা বা ভাইয়ের নাম। যিনি এলাকায় পরিচিত। ** স্কেচ ম্যাপ সরাসরি গুগল ম্যাপ থেকে আঁকতে গেলে ঝামেলায় পড়বেন। কলম বা পেন্সিল দিয়ে খুব সাধারণ রেফারেন্স পয়েন্ট দিয়ে দিয়ে আঁকবেন। শুরুর পয়েন্ট হবে 'জার্মান অ্যাম্বাসি ঢাকা' থেকে। এক্ষেত্রে কোন যানবাহন ব্যবহার করা হবে ঠিকানায় পৌঁছানো পর্যন্ত তা উল্লেখ করবেন। কারও Sample লাগলে জানাতে পারেন। ** রেফারেন্স পয়েন্ট সহ ঠিকানাগুলোর আলাদা আলাদা ছবি ভালোভাবে 3R/ 4R সাইজে প্রিন্ট করিয়ে নিবেন দুটি করে। ** বিয়ের ছবি, আপনার স্পাউসের ছবি, বিয়েতে দুজনের ছবি, বিয়ের গ্রুপ ছবি, বিয়ের আগের ছবি (পূর্ব পরিচয় থাকলে বা অ্যাফেয়ার ম্যারেজ হলে) এগুলো তুলে রাখবেন কষ্ট করে। এবার আসি কীভাবে জমা দিবেন আপনাকে দুই সেট কাজগ-পত্র জমা দিতে হবে। প্রতিটি সেটে কী কী থাকছে (একটি করে)- -ভিসা অ্যাপ্লিকেশন ফর্ম, -ছবি, -ডিক্লারেশন ফর্ম, -জন্ম সনদের ফটোকপি, -ম্যারিজ সার্টিফিকেট এর ফটোকোপি -নিকাহ নামা এর ফটোকপি, -ল্যাংগুয়েজ সার্টফিকেট এর ফটোকপি, -পাসপোর্ট ডাটা পেইজের ফটোকপি, -আনমেল্ডুং (সিটি রেজিস্ট্রেশন পেপার) ফটোকপি, -জার্মান রেসিডেন্স কার্ডের ফটোকপি, -দুইজনের জন্য জার্মান হাউস কন্ট্রাক্ট এর ফটোকপি, জব কন্ট্রাক্ট এর ফটোকপি, -ব্যাংক স্টেটমেন্ট (যদি প্রয়োজন হয়), -জার্মানিতে যিনি আছেন, তাঁর সম্পূর্ণ পাসপোর্টের ফটোকপি, -আলাদা আলাদা সব স্কেচ ম্যাপের ফটোকপি, -বিয়ের কিছু ছবি... এভাবে দুটি সেট তৈরি করবেন। দুটি সেটে দুটি পাসপোর্ট সাইজের ছবি থাকবে এবং আরেকটি ছবি সাথে থাকবে অ্যাম্বাসি ফেস করার সময়। ভিসা অফিসার চেয়ে নিবেন। সকল কাগজ পত্র একটির পেছনে আরেকটি দিয়ে 'জেমস-ক্লিপ' দিয়ে লাগিয়ে দিবেন। স্ট্যাপল না করা উত্তম। ছবিও 'জেমস-ক্লিপ' দিয়ে লাগিয়ে রাখবেন। ভিসা অফিসার নিজের মতো আঠা লাগিয়ে নিবেন। দুই সেট কাগজ-পত্রের পাশাপাশি মূল কাগজগুলো সাথে রাখতে হবে। যেসব মূল কাগজ সাথে রাখতে হবে- -পাসপোর্ট, -একটি এক্সট্রা ছবি (যেটির কথা উল্লেখ করেছি যে 'ভিসা অফিসার চেয়ে নিবেন') -জন্ম সনদ, -বিয়ের সনদ, -নিকাহ নামা, -ল্যাংগুয়েজ সার্টিফিকেট। সনদগুলো ফটোকপির সাথে মিলিয়ে দেখবেন ভিসা অফিসার। আরেকটি কথা না বললেই নয়- অবশ্যই ভেরিফিকেশন ফি বাবদ ২৪০০০ বাংলাদেশী টাকা দিতে হবে অ্যাম্বাসিতে। সাথে সাধারণ ফি বাবদ ৭৫ ইউরো এর সমপরিমান বাংলাদেশি টাকা। এক্ষেত্রে ইউরো এর রেট দেখে কিছু ভাংতি টাকা নিয়ে যাবেন। অর্থাৎ সাথে কিছু ১০০, ৫০, ২০, ১০ টাকার নোট রাখতে পারেন।

আশা করি আপনারা চেকলিস্ট অনুযায়ী কাগজ-পত্র গুছিয়ে নিতে সক্ষম হবেন। লেখার মধ্যে কোনো ধরনের অসঙ্গতি পেলে জানাবেন। পরবর্তী পর্বে নিজের অভিজ্ঞতা শেয়ার করার চেষ্টা করবো। প্রথম পর্বের লিংক- https://www.bessig.de/post/ফ-য-ম-ল-র-ইউন-য-ন


লিখেছেনঃ মুহিব হাসান (রোমান )

Subscribe to Our Newsletter

© BESSiG. বিনা অনুমতিতে এই ওয়েবসাইটের কোনো কন্টেন্ট অন্য যেকোন ওয়েবসাইট বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।