ফ্যামিলি রি-ইউনিয়ন, তৃতীয় পর্বঃ নিজের অভিজ্ঞতা

লিখেছেনঃ মুহিব হাসান, এমএসসি ইন এনভাইরনমেন্টাল এন্ড রিসোর্স মেনেজমেন্ট, বিটিইউ কটবুস, জার্মানি।

জার্মানিতে আসার পূর্ব থেকেই মাথায় ছিলো শুধু কীভাবে জীবনসঙ্গীকে দ্রুতই নিয়ে আসা যায়। অথচ তখনও নিজের আসা কনফার্ম ছিলোনা!! তাও সাধ ও স্বপ্ন দুটোই বাস্তবায়নের জন্য জরুরী বলে পথটা চলা সহজ হয়ে যায়।

জার্মানিতে এসেছিলাম গত বছরের সামারে। সামার সেমিস্টার শুরু হওয়ার অনেক আগেই চলে এসেছিলাম ছোটখাটো ভার্সিটিজনিত ‘মিস-আন্ডারস্ট্যান্ডিং’ এর কারণে। যদিও আগে আসাটা কিছুটা হলেও সুবিধার কারণ হয়েছে। কারণ, নতুন শিক্ষার্থিদের চাপ কম থাকায় আসার পর থেকে নিজের সকল কাজ সারতে বেশিদিন লাগেনি। ইন্সুরেন্স, ব্যাংক একাউন্ট খোলা, ব্লক আনব্লক করা, এনরোলমেন্ট করা, ম্যাট্রিকুলেশন সার্টিফিকেট ম্যানেজ করে ভিসা এক্সটেনশন কার্ড হাতে পেতে সময় লেগেছে ১.৫ মাসের মতো।

সবে মাত্র ভার্সিটির ক্লাস শুরু। এর মধ্যেই চলে গেলাম ‘আউসল্যান্ডার বিহোর্ডে’-তে। অন্যদিকে, বউকে চট্টগ্রামের ‘ডি-স্প্রাখে’-তে ১.৫ মাসের ইন্টেনসিভ কোর্সে ভর্তি হয়ে যেতে বললাম।

‘আউসল্যান্ডার বিহোর্ডে’-তে গিয়ে বললাম, 'আমি স্পাউস আনতে চাই।' আল্লাহ দিলে আমার ভিসা অফিসার ইংলিশ বলেনা। উনারও দোভাষী প্রয়োজন! তার উপর তখন আমি জানতাম না এক কলমও জার্মান। যদিও এখনু জানিনা।

যাই হোক, উনি উনার এক সহকর্মীর সাহায্য নিয়ে জানালেন যে, আমার স্পাউসের ব্লক লাগবে। বাসা লাগবে। আমি জানালাম যে, আমার বাসা আছে। তিনি চিন্তা করলেন আর কত বড় বাসা-ই বা হবে! বললেন- ‘বড়’ বাসা লাগবে! আমি তখন যে বাসায় থাকতাম তার সাইজ ছিলো ২৪.৫ বর্গ মিটার। জানালাম তাঁকে। তিনি আরও এক কাঠি সরস! বললেন ৫০ বর্গ মিটার লাগবে বা এর কাছাকাছি!! পুরাই তাজ্জব বনে গেলাম। বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে, আমি জানি দুইজনের জন্য ২৪ হলেই এনাফ। তাছাড়া আমি যেখানে থাকি, সেখানে আরও কয়েকজন দুইজনের ‘আনমেল্ডুং’ নিয়ে থাকে। অফিসার মহোদয়া মানতে নারাজ। তিনি বলিলেন- ‘নয় নয় নয়। হইপেনা!!!’

৫০ বর্গ মিটারের বাসা কি আমি চুরি করে ম্যানেজ করবো!!??- মেজাজটা খুব খারাপ ও হতাশা একটু করে দেখা দেয়া শুরু করল। সিদ্ধান্ত নিলাম এখানে আর থাকা যাবেনা। তাড়াতাড়ি জার্মানিতে আসায় এবং খোঁজ নিতে পারায় হাতে পর্যাপ্ত সময় ছিলো উইন্টারের জন্য এপ্লাই করার। বসে পড়লাম ভার্সিটি খুঁজতে। সামারে হাতে তেমন কোনো ‘চয়েজ’ ছিলোনা ‘সিভিল ইঞ্জিনিউয়ারিং’ নিয়ে পড়ায়। উইন্টারে মুখস্থ বড় সিটি এবং এর আশেপাশের ভার্সিটি গুলোতে নিজের সাবজেক্টের আশেপাশের গুলোতে সহ এপ্লাই করে দিলাম। মোটামুটি জুলাইয়ের শেষের মধ্যে ৩টা অফার লেটার পেলাম।

সাবজেক্ট বা ভার্সিটির Ranking আমার কাছে কখনই খুব বেশি গুরুত্ব পায়নি। তাই এসব আমার জন্য যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিলো, তার চেয়ে বেশি ছিলো সেসব সিটিতে স্পাউস আনাটা কতটা সহজ তা জানা। খোঁজ নেয়া শুরু করলাম। জানতে পারলাম এখন যেই ভার্সিটিতে আছি, এখানে স্পাউস আনা সহজ। এক বড় ভাই স্পাউস এনেছিলেন। তিনি অনেক সাহায্য করেছেন তথ্য দিয়ে। ওকে দেন…ডিসাইডেড!!!

ভর্তি হওয়ার আগেই চলে গেলাম তখনকার ‘হবু ভার্সিটি’র আউসল্যান্ডারে এক ভাই-বন্ধু নিয়ে। খবর নিলাম কাহিনী কী জানতে!! বলল- স্পাউস আনা যাবে, ব্লক করা লাগবে, বাসা ২৪-২৫ বর্গ মিটার হলেই হবে। শান্তি!!!

আগের সিটিতে বাসা ছাড়ার নোটিশ দিলাম। আগের বাসার সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিলো- এক মাসের নোটিশেই বাসা ছাড়া যেত, যে সুবিধা জার্মানিতে পাওয়া দুষ্কর। নতুন সিটিতে বাসা খোঁজার পালা।

ও আচ্ছা এতক্ষণ তো আমার বউয়ের কথাই বলিনি!!! আমার স্পাউস দেশে ল্যাংগুয়েজ ক্লাসের সহপাঠিদের থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ‘নেগেটিভ’ কথা শুনত আর দুশ্চিন্তা করত। করাটা স্বাভাবিকও ছিলো তখন। একজন দায়িত্ব নিয়ে বলেছিলেন, ‘আপনার হাজবেন্ড গেছে এখনও ৩মাসও হয়নি, ভিসা না হওয়ার সম্ভাবনাটাই বেশি!!!’ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তখন দিনভর আলোচনা চলত।

এরমধ্যে A1 ক্লাস শেষ। পরিক্ষার ডেট নিয়ে ফেলল জুলাইয়ের জন্য।

অনলাইনে বাসা খুঁজতে শুরু করলাম। একটি কোম্পানির খবর পেলাম, সশরীরে চলে গেলাম এই সিটির-ই আরেক ভাই-বন্ধুকে নিয়ে তাদের অফিসে। বললাম ‘বাসা দাও দুইজনের জন্য।‘ কয়েকটা প্রস্পেক্টাস দিলো। বলল পরের দিন দেখতে পারব। কিছু করার নেই।

ভাই-বন্ধু জোর করল থেকে যেতে। এই ভাই-বন্ধু কাউকেই চিনতাম না জীবনে। সবাই ক্ষণিকেই অনেক কাছের হয়ে গেল। সেদিন থেকে গেলাম ‘কটবুসে’। পরের দিন বাসা দেখাতে পারল না কোনো এক অজানা কারণে। যে বাসা দেখানোর কথা তারে বুঝাইলাম যে, 'দেখ বইন! আমার বাসা দরকার, আমি অন্য সিটি থেইকা আইসি। পিলিজ একখান বাসা দে!’

পরের দিন সকালে আবার টার্মিন। এইবার বাসা দেখাল। শুধুমাত্র ‘বারান্দা’ না থাকার কারণে বাসা নিলাম না, বললাম- পিলিজ আরেকখান বাসা দেখান বারান্দা সহ। বেচারি একই দিন বিকালে আবার টার্মিন দিলো। এইবার বাসা ওকে। পরের দিন বলল কন্ট্রাক্ট সাইন ও বাসার চাবি বুঝে নেয়ার কথা। এইবারও কোনো এক অজানা কারণে বাসার কন্ট্রাক্ট সাইন হলোনা।

আগের সিটিতে ফিরে গেলাম। পরে আরেকদিন এসে কন্ট্রাক্ট সাইন করলাম ও বাসা বুঝে নিলাম। এই প্রসেসিং জটিল মনে হলেও বাসা এতো তাড়াতাড়ি পেয়েছিলাম। কারণ, এবারও নতুন উইন্টার সেমিস্টার শুরু হওয়ার অনেক আগেই মুভ করেছিলাম। তাই প্রেসার কম ছিলো সব কিছুর।

অন্যদিকে অ্যাম্বাসি ডেট খোঁজার কাজও চলছিলো। আগস্টের ২৮/২৯ তারিখে একটা ডেটও নিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু ভার্সিটি পরিবর্তন করার ব্যাপার ছিলো, সাথে নতুন ম্যাট্রিকুলেশন পেপারের দরকারও ছিলো। তাই ডেট চেঞ্জ করে একমাস পর সেপ্টেম্বরের ২৯ তারিখ ডেট নিয়ে নিলাম।

ভার্সিটির কাজ শেষ হলো। নিজের কাজ গুলো একে একে শেষ করে নিলাম। জব কন্ট্রাক্ট, বউয়ের জন্য ব্যাংক স্টেটমেন্ট, হাউস কন্ট্রাক্ট, নিজের ফুল-পাসপোর্ট সহ যা যা প্রয়োজন মনে হয়েছে সবই স্ক্যান করে দেশে পাঠিয়ে দিলাম। স্পাউসের যা যা লাগবে সব বউ নিজেই রেডি করল সাথে স্ক্যাচ ম্যাপও। A1 ও পাশ করে ফেলল একবারে খুব ভালোভাবে।

২৯ সেপ্টেম্বর অ্যাম্বাসি ডেট ছিলো। ভিসা অফিসার নিজের মতো ডকুমেন্টস ঠিক করতে করতে যা যা জিজ্ঞেস করার সবই করল। যেমন- আপনার হাজবেন্ড দেশে কী বিষয়ে পড়ালেখা করেছে, আপনি কী করেন, ডাক্তার হয়েও পড়ালেখা করতে না গিয়ে স্পাউস হিসেবে কেন যাচ্ছেন, আপনাদের কি লাভ ম্যারেজ নাকি অ্যারেঞ্জ, বিয়ে কোথায় হয়েছিলো, কাজীর ঠিকানা আপনার ঠিকানা থেকে আলাদা কেন, ছবিতে কে কে আছে (বিয়ের ছবি দেখে), আপনাদের বিয়ের আগে পরের ছবি আছে কিনা ইত্যাদি।

এতসব প্রশ্নের উত্তর ও ডকুমেন্টস দেয়ার পরও আমার ‘রেসিডেন্স কার্ড’ মিসিং ছিলো। ভিসা অফিসার বললেন- আপনার সাথে কি আপনার হাজবেন্ডের এখন যোগাযোগ করা সম্ভব?- আপনি যেহেতু চট্টগ্রাম থেকে এসেছেন তাই আপনি সম্ভব হলে আমাকে ১ ঘন্টার মধ্যে মেইল করে আপনার হাজবেন্ডের রেসিডেন্স কার্ড পাঠিয়ে দিয়েন। ….যেভাবে যা বলা হয়েছিলো সবই করা হয়েছিলো।


আমাকে আউসল্যান্ডার থেকে বলেছিলো যে, তিন সপ্তাহের মধ্যে তাদের কাছে বাংলাদেশ থেকে কাগজ-পত্র চলে যায়। অ্যাম্বাসি ফেস করার পর থেকেই তিন সপ্তাহ গোনা শুরু। ২০ দিনের মাথায় দেশে ভেরিফেকেশনে লোক আসল। ভেরিফেকেশন হয়ে গেল। এর কিছুদিন পর আবার চলে গেলাম আউসল্যান্ডার-এ। জানাল কোনো কাগজ তাঁরা এখনও পায়নি। আমার মেইল-অ্যাড্রেস রাখল। বলল জানাবে।

এবার টেনশনের পালা। দেশে কী তাহলে ঠিকভাবে ভেরিফিকেশন হয়নি? নাকি নেগেটিভ?- আবার অধৈর্য্য হয়ে গেলাম আউসল্যান্ডার। আমার অফিসার বেচারি কইল- ‘একটু সবুর ধর বেটা। বউ আনতে চাস, আবার ধৈর্য্য ও ধরস না, কেমনে হইব!’। কইলাম- ‘আফা (আপা) আপনে যা কন (বলেন), কারণ, আফনার কলমের এক খোঁচায় এখন আমার দুনিয়া উল্ট্যাইয়া-পাল্টাইয়া ডিগবাজি খাইব (খাবে)।‘

নভেম্বর ১১, ২০১৯। আউসল্যান্ডার থেকে মেইল আসল যে কাগজ আসছে তাঁদের হাতে। আমার কিছু কাগজ-পত্র চাইল। বলল মেইল করলেই হবে। তাও একটা ধন্যবাদ দিতে আবারও চলে গেলাম আউসল্যান্ডারে!!!। আউসল্যান্ডারে যতবার কিছুদিনের ব্যবধানে গিয়েছিলাম, হয়ত কেউ অবসার্ভ করলে মনে করত যে, আমি মনে হয় বিশাল কোন গ্যাঞ্জাম লাগিয়ে বসে আছি। এখন শুরু দৌড়াচ্ছি!!!

আউসল্যান্ডারের ‘তিনি’ বললেন ‘It seems all ok, I will give my decision this week.’ তা-ও কলিজায় পানি নাই। ডিসিশন আবার কী, কয়না (বলেনা) কেন যে ভিসা দিব???? কইলাম-পিলিজ লাগে আফা, একটা ভালা ডিসিশন দিয়েন। বেচারি আমার অবস্থা দেখে হেসে দিল। বলল সে তাঁর সাধ্যমত করবে।

এক সপ্তাহ পরে ১৮ তারিখে মেইল দিলাম। বললাম যে, এক সপ্তাহ পার হয়ে গেলো! এখনও কিছু জানতে পারলাম না। তিনি জানালেন যে, ‘the visa was approved. Please have some patience with the issuance of the visa.’ ওই মুহূর্তটাতেই বুঝি মনে হয়- Life is Beautiful…

২০.১১.২০১৯ তারিখে জার্মান অ্যাম্বাসি বাংলাদেশ থেকে মেইল আসলো- ডিসিশন আসছে। ট্রাভেল ইন্স্যুরেন্স নিয়ে গিয়ে দেখা করতে…

অনেক কিছুই আমি করেছি যা করা প্রয়োজন ছিলো, আবার অনেক কিছুই না। যেমন আউসল্যান্ডারে বারবার ‘বিরক্ত’ করাটা অনেকের জন্য ভালো না-ও হতে পারে। তাঁরা এসবে বিরক্ত হয়। আমাকে ‘পাগল’ ভেবে ছেড়ে দিসে হয়ত।

জার্মানিতে আসার আগে শুধু জার্মানিতে এক বন্ধু ছাড়া কাউকেই চিনতাম না। সেই আমার জার্মানিতে আসার পর এবং ২৯.০৯.২০১৯ অ্যাম্বাসি থেকে ২০.১১.২০১৯ পর্যন্ত দিনগুলোর অভিজ্ঞতা একটা বিশাল বই লেখার সমান, যা এখানে বুঝিয়ে লেখাও সম্ভব না। এই সময়ের মধ্যে যে মানুষগুলোর সাপোর্টের কথা না বললেই নয়- রায়হান, জান্নাত আপু, সাদ্দাম ভাই (যে মানুষটাকে জার্মানিতে নেমেই প্রথম দেখেছিলাম এবং পরে জানতে পারলাম তিনি এই গ্রুপেরই সম্মানিত অ্যাডমিন), মাহবুব ভাই, মুরাদ ভাই, টিপু ভাই, শাহজাহান ভাই, বিটন ভাই, পিয়াস ভাই, মুশফিক ভাই, জাকের ভাই, মানিক ভাই, ফাহাদ ভাই, তুষার ভাই, আসাদ ভাই, কফিল ভাই, হোসেন ভাই সহ আরও অনেকে। যাঁদের নাম ভুলে লিখতে পারিনাই, তাঁরাও আছেন আমার লিস্টে।

জীবনটা সুন্দর…সবার জীবন হোক সুন্দর!

প্রথম পর্বঃ https://bit.ly/2C5rv8u

দ্বিতীয় পর্বঃ https://bit.ly/32dynew





Subscribe to Our Newsletter

© BESSiG. বিনা অনুমতিতে এই ওয়েবসাইটের কোনো কন্টেন্ট অন্য যেকোন ওয়েবসাইট বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।