ফ্যামিলি রিইউনিয়ন ভিসা



লিখেছেনঃ মুহাম্মদ সাহেদুল আলম



এই প্রবাসে সব থাকার পরও একসময় জীবনের সবচেয়ে বড় আফছোস হয়ে যায়, পরিবারের সান্নিধ্য থেকে বহুদূরে থাকা। সারাদিন হয়ত সব ভাল ভাবেই কেটে যায়। ভার্সিটি – ল্যাব – লাইব্রেরি – কাজ সবকিছু মিলিয়ে কেমন করে যেন একেকটা ব্যস্ত দিন ফুরিয়ে যায়। মাঝে মাঝে হয়ত ইউরোপের রূপ দেখা; কিংবা উইকেন্ডে ৫ ইউরো এন্ট্রি ফি দিয়ে বিয়ারের বোতল নিয়ে কোন ক্লাবে রাত পার – তবে এই জীবন কিন্তু খুব বেশি দিন ভাল লাগে না। বরং এই সাময়িক আনন্দে একসময় বিষন্নতা আরও বাড়ে। বেলাশেষে একরাশ শূণ্যতার ভিড়ে মনে হয়, “যদি পরিবারটা থাকত!” ভাল – মন্দ যাই হোক পরিবারই একটা মানুষের ভালোবাসার শেষ ঠিকানা। পরিবার বলতে মা-বাবা-ভাই-বোন-বউ-বাচ্চা বোঝালেও, এখানে আমি বউ-বাচ্চার জন্যই লিখছি।

ননইউরোপিয়ান ক্যাটাগরীতে বাংলাদেশ থেকে দুই ধরনের জার্মান ফ্যামিলি রিইউনিয়ন ভিসা বর্তমানে চালু আছে:

১. বিবাহ সম্পাদিত: Family Reunion

২. বিবাহের সম্ভাবনা: Intended Marriage / Establishment of a Civil Union in Germany

দুই নম্বরটার ব্যাপারে আমি যেটা বুঝেছি তার সারসংক্ষেপ হল, “যদি German Civil Registrar এর কাছে বিবাহের তারিখ ঠিক করে একটা marriageability certificate (Anmeldung zur Eheschließung / Eintragung einer Lebenspartnerschaft) জোগাড় করা যায়; তবে এই ভিসায় দরখাস্থ করা যাবে। কিন্তু সমস্যা হল, এই দেশে বিবাহ কাজটা খুব জটিল। যার জন্য এরা বিবাহ না করে বরং লিভ টুগেদার করে।” সুতরাং এই ব্যাপারে কথা না বাড়িয়ে আমি সম্পাদিত বিবাহের ব্যাপারে কথাই বলব।

Family Reunion ভিসার জন্য স্কলারশিপ হোল্ডারদের সুযোগ একটু বেশি। কারন, DAAD সবসময়ই পরিবারকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। এমনকি স্কলারশিপের পরিমান পরিবার আনার জন্য যথেষ্ট না হলেও, DAAD লাগলে ভিসা অফিসের সাথে যুদ্ধ করে ভিসার ব্যবস্থা করে - যদি কাগজপত্র ঠিক থাকে। তবে ছাত্রাবস্থায় কেবল বউ আনা যতটা সহজ, বাচ্চা থাকলে বিষয়টা একটু কঠিন হয়ে দাঁড়ায় বলেই মনে হচ্ছে।

Family Reunion ভিসার চেকলিস্ট:

(বিস্তারিত https://dhaka.diplo.de/blob/2076250/e9d8da5425eab89eedf7dbf87e811b47/fz-data.pdf )

  • জন্ম নিবন্ধন (অনলাইনে চেক করা যায় তেমন। অনলাইনে চেক করা না গেলে নতুন করে করতে হবে।)

  • কাবিন নামা (বাংলা এবং ইংরেজি) এবং ম্যারিজ সার্টিফিকেট , কাজী অফিসের ঠিকানা সহ।

  • জার্মান ভাষা শিক্ষা সার্টিফিকেট, লেভেল এ – ১ (DAAD স্কলারদের পরিবারের প্রয়োজন নেই।)

  • জার্মানীতে বাস করা পরিবারের সদস্যের Registration certificate “Meldebescheinigung” এবং valid German Residence permit।

  • বাসার চুক্তিনামা, যেখানে পরিবারের সবাই থাকতে পারবে। প্রতি জনের জন্য সিটি থেকে বলে দেয়া একটা নির্দিষ্ট আয়তন থাকে, তার কম হলে ভিসা পাওয়া সম্ভব না।

  • অর্থনৈতিক উৎসের প্রমাণ : হতে পারে স্কলারশিপ, চাকুরী কিংবা ব্যাংকের টাকা।

  • স্কেচ ম্যাপ: দুই পরিবারের স্থায়ী, অস্থায়ী ঠিকানা এবং কাজী অফিস।

  • ভিসা ফি (DAAD স্কলারদের পরিবারের প্রয়োজন নেই।)

  • ভেরিফিকেশন ফি : ২৪,০০০ টাকা।

কিছু সাধারন প্রশ্নের উত্তর:

১. উচ্চশিক্ষায় আসতে চাওয়া ব্যক্তির সাথে একইসময় পরিবার নিয়ে জার্মানী আসা অসম্ভব। কারন যদিও মাইগ্রেশন আমাদের প্রধান লক্ষ্য, কিন্তু বলে কয়ে মাইগ্রেশন বিষয়টা কার বা পছন্দ? সুতরাং, ভাল হয় একজন এখানে এসে সব গুছিয়ে দরখাস্থ করা। তবে DAAD স্কলাররা ইচ্ছে করলে জার্মানীতে আসার আগেই দরখাস্থ করে আসতে পারেন। পরে এখোনে এসে মিসিং ডকুমেন্ট পাঠিয়ে দিলে হয়, তারপর পরিবারের জন্য ভিসা ইস্যু হবে।

২. নিজের জন্য ব্লক একাউন্ট করলেও পরিবারের জন্য ব্লক না করলেও চলে। সে ক্ষেত্রে ব্যাংকের ব্যালেন্স দেখানো প্রয়োজন। একটা সহজ হিসেব বলি – বাসা ভাড়া, ইন্সুরেন্স, ইউটিলিটি বিল দেবার পর প্রত্যেক পরিবারের সদস্যের জন্য মাসিক প্রায় ৩৬০+ ইউরো থাকলে ভিসা পাবার সম্ভাবনা বাড়ে।

৩. এখানে আসার পর দেশে গিয়ে বিয়ে করলেও পরিবার আনা যায় – একটু কঠিন; অসম্ভব না। কারনটা জানা নেই।

৪. মায়ের পক্ষে সন্তান আনাটা অসম্ভব। বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী পিতা সন্তানদের অভিভাবক। সুতরাং আদালতের মাধ্যমে অভিভাবকত্ব বদলানো ছাড়া শুধু সন্তান আনা সম্ভব না এক্ষেত্রে। তবে সিংগেল মাদার বা বিবাহ বিচ্ছেদের পর আইন অনুযায়ী মা সন্তানের অভিভাবক হলে, তিনি সন্তানের জন্য দরখাস্থ করতে পারবেন।

৫. পরিবারের জন্য ভিসা ক্যাটাগরী ৩০, যা ছাত্র ভিসার চাইতে শক্তিশালী। এই জন্য পরিবারের সদস্য/সদস্যা ফুল ওয়ার্ক পার্মিট পাবেন। তাছাড়া এই ভিসার সুযোগও বেশি।

৬. বৃদ্ধ বাবা-মা আনা বেশ কঠিন। তারা ৯০ দিনের ভিসায় বার বার ঘুরতে আসতে পারেন। সেই ভিসায় সমস্যা হয় না সাধারনত। কিন্তু রেসিডেন্স পার্মিট নেবার চেষ্টা করলে বেশ কঠিন। তাছাড়া তারা কাজ করতে না পারলে তখন নিজের টাকায় ইন্সুরেন্স দিতে হয়। যার সঠিক পরিমান আমি জানি না। তবে পরিমান মাসিক ৫০০+ ইউরোর কম নয় শুনেছি।

২০১৭ সালে জার্মানীতে আসবার জন্য অফার লেটার পাবার পর পরই আমার প্রথম প্রশ্ন ছিল, “আমার একমাত্র আপন বউকে কেমন করে নেব!” উত্তর পেয়ে যেটা বুঝলাম, আমি যাবার সময় নেয়া কিছুটা অসম্ভব কিন্তু আমি গিয়ে চেষ্টা করলে সম্ভাবনা বেড়ে যাবে। এসে কোর্স অথরিটিকে বললাম, বউ লাগবে। সে একটু অনীহা দেখালো কৌশলে। তার ধারনা ছিল, এখনই বউ আনলে পড়ালেখা গোল্লায় উঠবে। পরে আমি DAAD অথরিটিকে বললাম, পরিবার ছাড়া সব শূণ্য মনে হচ্ছে। তারা দেরী না করে সাপোর্ট পেপার দিল। সব নিয়ে দরখাস্থ করলাম। ভিসা অফিসের প্যারায় দুই বার ভেরিফিকেশন করা লাগল। মানে ৪৮,০০০ টাকা!

চার মাসেও যখন ভিসা হল না, ভিসা অফিসে গিয়ে একদিন ভিসা অফিসারকে বললাম, “বউয়ের ভিসা দাও, না হয় জার্মানীতে বিয়া করিয়ে বউ দাও, গার্লফ্রেন্ডে চলবে না আমার!” ভিসা অফিসার মহিলা আমার কথা শুনে হা করে তাকিয়ে ছিল কতক্ষন।

পরে কোর্স অথরিটি আর DAAD অথরিটির চেষ্টায় ভিসা হয়েছিল। বউ যেদিন জার্মানীতে আসে, সেদিন আমার একটা কোর্স ফাইনাল পরীক্ষা ছিল! কিসের পরীক্ষা, সারারাত পড়েও সকালে সব বাদ দিয়ে ছুটেছিলাম এয়ারপোর্টে। কারন ততদিনে আমি জানি, জীবনে পরিবারের চেয়ে আপন কিছু নেই!

তবে সত্যি বলতে Family Reunion ভিসা কিছুটা হতাশাজনক, দীর্ঘ সময়ের এবং বার বার ব্যর্থ হবার মত একটা ভিসা ক্যাটাগরী।

-মুহাম্মদ সাহেদুল আলম

মাস্টার্স ইন এগ্রিকালচারাল সায়েন্স এন্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট ইন ট্রপিক্স এন্ড সাবট্রপিক্স (DAAD Fellow ), ইউনি বন।

পিএইচডি গবেষক (DFG Fellow), ইউনি বন।

নভেম্বর ২৩, ২০১৯। বন, জার্মানী।

Subscribe to Our Newsletter

© BESSiG. বিনা অনুমতিতে এই ওয়েবসাইটের কোনো কন্টেন্ট অন্য যেকোন ওয়েবসাইট বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।