রোড টু জার্মানিঃ লোন করে আসা কতটা যৌক্তিক??

লিখেছেনঃ মুহিব হাসান, এমএসসি, বিটিইউ কটবুস, জার্মানি।


দিন যত যাচ্ছে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের মাঝে জার্মানিতে আসার প্রবণতা বাড়ছে। সময়ের সাথে সাথে এই প্রবণতা আরও বাড়বে, মোটামুটি স্বাভাবিকই বলা যায়। বিষয়টি জার্মানিতে আমরা যারা অবস্থান করছি তাদের জন্যও আনন্দের। কারণ, আমাদের দেশের শিক্ষার্থীরা 'উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত' হওয়ার পথে পা বাড়াচ্ছে।

উচ্চশিক্ষার পথে পা বাড়ানোর ক্ষেত্রে অনেকের অনেক বাধা থাকে। কারো পারিবারিক সমস্যা, কারো বা সামাজিক সমস্যা। কিন্তু অনেকেরই যেই সমস্যাটা কমন থাকতে দেখি, তা হলো অর্থনৈতিক সমস্যা। শেষ সমস্যাটি নিয়েই একটু আলোচনা করা যাক।


স্কলারশিপ ছাড়া জার্মানিতে পড়তে আসার সময় আমরা কমবেশি সবাই জানি যে, ব্লক একাউন্টের প্রয়োজন হয়। এই ব্লক এমাউন্টের পরিমাণ বাংলাদেশি টাকায় এখনের হিসাবে প্রায় ১০,৫০,০০০ (সাড়ে দশ লক্ষ)। ব্লক এমাউন্টের পাশাপাশি রয়েছে প্লেন-ফেয়ার, এনরোলমেন্ট ফি, ডর্ম/বাসার অগ্রিম ভাড়া, টুকিটাকি বাজার সদাই সহ টুকিটাকি খরচ। আসার সময় ইমার্জেন্সি হিসেবে সাথে রাখতে হয় আরও কিছু টাকা পয়সা। সব মিলিয়ে খরচের পরিমাণ স্থান, কাল ও ব্যক্তিভেদে ১২-১৪ লক্ষ!!!


অনেকেরই আল্লাহর রহমতে সামর্থ্য রয়েছে; আলহামদুলিল্লাহ। তাঁদের জন্য আসার পথটি একটু সহজ। কিন্তু অনেকেরই সামর্থ্য নেই। তাঁরা কী করেন???


অনেকেই নিজের বা বাবা-মায়ের জমানো থেকে বিদেশে পাড়ি জমান। অনেকেই ফ্যামিলি মেম্বার, বন্ধু-বান্ধব ও আত্মীয়স্বজনদের কাছ থেকে ধার করেন। আবার অনেকেই ব্যাংক ও বিভিন্ন মাধ্যম থেকে লোন করেন। এই লোন বা ধারের পরিমাণ একেকজনের একের এমাউন্টের, যা নিয়ে আলোচনাটা আরও একটু দীর্ঘ করা যাক।


যাঁরা কারও কাছ থেকে বিনা সুদে 'আনলিমিটেড-টাইম' নিয়ে লোন করবেন (অর্থাৎ যখন পারেন আস্তে আস্তে শোধ করবেন), তাঁদের জন্য ব্যাপারটা একটু সহজ। আবার যাঁরা অল্প কিছু লোন করে আসবেন, তাঁরাও কিছুটা 'সেফ-জোন' এ থাকবেন। কিন্তু অনেকেই আছেন যাঁরা একটি নির্দিষ্ট সময় বা সুদে লোন করে আসবেন। এই চিন্তা করছেন যে, আসার পরপরই ব্লক আনব্লকড হয়ে যাবে, একটা পার্ট-টাইম ম্যানেজ করে নিবেন, ব্লকের টাকা দেশে পাঠিয়ে দিবেন আর পার্ট-টাইম দিয়ে নিজে চলবেন!!!


সাধারণ বাস্তবতায় আসা যাক। জার্মানিতে আসার পর কিছু টুকটাক খরচ থাকবে। আসার সাথে সাথেই আপনার খরচ শুরু। চোখ, কান বন্ধ করে ঘরে বসে থাকলেও বাসা ভাড়া, ইন্স্যুরেন্স, খাওয়া খরচ যাবেই। এতেই বড় অঙ্কের একটি খরচ চলে যায়। মোট কথা, 'আসা' এর আগেই 'যাওয়া' শুরু।


'পার্ট-টাইম সব সিটিতে পাওয়া যায়না।'- কথাটি মোটাদাগে সত্য। ছোট শহরগুলোতেও দুই একটা চাকরি থাকে। কিন্তু সেগুলোতে হয় ল্যাংগুয়েজ লাগবেই, বা 'মিনি জব' অফার করবে, বা তাঁদের লোক দরকার থাকেনা বছরের বিশাল একটা সময়। তাই, ছোট শহরগুলোতে কাজ পাওয়া কষ্টকর। তবে, সুবিধার ব্যাপার হলো, প্রত্যেকটি ছোট শহর থেকেই বড় কোনো শহরে মোটামুটি ১-২ ঘন্টার মধ্যে যাওয়া যায়। আর বড় শহরে কাজের চাহিদাও থাকে। কিন্তু 'বড়' শহরগুলো যদি বার্লিন, মিউনিখ, ফ্রাংকফুর্ট, হামবুর্গ বা NRW এর বড় কিছু শহরের মধ্যে না পড়ে, তাহলেও বেগ পেতে হতে পারে।


উপরের কথাগুলোর সারমর্ম হলো- সব কাগজ পত্র ঠিক করে মাসিক ৮০ ঘন্টার কাজ জোটাতে গড়ে আনুমানিক সময় লাগতে পারে ৬ মাস!!! জি, স্বাভাবিক ঘটনা এটাই। আর করোনার এই সময়ে গত উইন্টারে এসে এখনও মিউনিখ বা বার্লিনের মতো জায়গায়ও কাজ পাননাই এমন শিক্ষার্থীদের সংখ্যা কিন্তু কম না!!!


অনেকেরই তাই, কাজ ঠিকভাবে জোটাতে গিয়ে ব্লকের টাকা-ই শেষ হয়ে আসে। ফলে, ধার শোধ করাটা হয়ে পড়ে এক বিরাট সমস্যা৷ আবার অনেকেই পড়ালেখার চাপে মাসে ৮০ ঘন্টা কাজ করতেও পারেন না। তাই, ধার শোধ করতে গিয়ে রীতিমত এক যুদ্ধের ভেতর দিয়ে যেতে হয়। এই যুদ্ধ সামলাতে গিয়ে ইউরোপে এসেও মানসিক-অশান্তির পাশাপাশি বিভিন্ন জটিলতায় জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠতে পারে।

লোন করে আসাটাকে খারাপ চোখে দেখার কোনো সুযোগ নেই। যেখানে স্বপ্ন অনেক বড়, সেখানে একটু কষ্ট করে যুদ্ধ করা-ই যায়। কিন্তু পরিস্থিতি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা রাখা আমার মতে আবশ্যক।

পরিশেষে বলব- জীবন মানেই কোনো না কোনো জায়গা থেকে 'যুদ্ধ'। তাই, যুদ্ধ করে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার মতো অদম্য শক্তি নিয়েই আসতে হবে জার্মানিতে।


আমার লেখায় নাকি অনেকে হতাশ হয়ে যান!!! একজন কাছের মানুষ বলেছেন-"প্রচুর আশা দিতে হবে।" তাই আগের প্যারাটি "প্রচুর আশা" দিতে লিখলাম।


ইনশাআল্লাহ দেখা হবে বিজয়ে।




Subscribe to Our Newsletter

© BESSiG. বিনা অনুমতিতে এই ওয়েবসাইটের কোনো কন্টেন্ট অন্য যেকোন ওয়েবসাইট বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।