একটি পেইড মাস্টার থিসিস প্লাস ইন্টার্নশীপ এবং ইহার আত্মকাহিনী; আমার অভিজ্ঞতা



শুরুতেই বলে দিচ্ছি এটা সম্পূর্ন আমার অভিজ্ঞতা থেকে লিখতেছি , আমার সাথে অন্য কারো অভিজ্ঞতা নাও মিলতে পারে। আমি জার্মানিতে Ecology তে মাস্টার্স শুরু করি, আমার ব্যাকগ্রাউন্ড মাইক্রোবাযোলজি ছিল বিধায় সব সময় ইকোলজির সাথে মাইক্রোবায়োলজির সম্পর্ক বের করার চেষ্টা করতাম । এইভাবে করতে করতে এক সময় রিসার্চ অ্যাসিস্ট্যান্ট জার্মানিতে HiWi নামে খ্যাত জবের জন্য আবেদন শুরু করলাম। এই ভাবে জার্মানি তে যুদ্ধের প্রথম ধাপ শুরু করলাম । আমি যে শহরে থাকতাম , তখন ২০১৮ ঐ সময়ে স্টুডেন্ট অ্যাসিস্ট্যান্ট জব পাওয়া কিছুটা কঠিন ছিল , তার উপর অনেকে বলল HiWi পাওয়া দুস্কর । হাতেগোনা কয়েকজন বাংলাদেশী তখন HiWi করত।


HiWi জব পাওয়ার পিছনের কাহিনী

মনের ভিতরে একটা জেদ নিয়া আবেদন করা শুরু করলাম ,জব পাওয়া পর্যন্তআবেদন করে যাব । যা হওয়ার হবে আবেদন করতে থাকি , ইমেইল করতে তো আর টাকা লাগে না। যতদুর মনে আছে মিনিমাম ১০০ প্রফেসর কে মেইল দিছিলাম , অনেক জায়গা থেকে সরাসরি রিজেক্টেট অথবা কোথাও রিপ্লাই দিচ্ছে তাদের পজিশান ফিল আপ হইয়া গেছে।প্রতিদিন সকালে এইসব মেইল দেখে ঘুম ভাঙত আর হতাশ হইতাম। একসময় এই বিষয়ে ধৈয্য এবং মোটিভেশান সব হারাইয়া ফেলি। একদিন ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে পৃথিবীর নামকরা সাইকলজিস্ট Walter Mischel - The Marshmallow Test ভিডিও দেখলাম , কিছুটা স্পীড ফেলাম।তখন চিন্তা করলাম ইন্টার্নশীপ এর জন্য আবেদন করি ,জব তো পাওয়া যাচ্ছে না । এইবার আমার কিছু দুর্বলতা বের করলাম এবং সেটা সমাধান করার চেষ্টা করলাম আবেদনের আগে , তা হল

১ আগে এলোপাতাড়ি আবেদন করতাম কিন্তু এই বার প্রত্যেকটা প্রফেসরের প্রোফাইল পড়ে তাদের রিসার্চ প্রজেক্ট দেখে আবেদন শুরু করি। এটা খুবই ইম্পটেন্ট যে তাদের রিসার্চের প্রতি আপনার ইন্টারেস্ট দেখানো , আপনার সাব্জেক্ট এর সাথে রিলেটেড কিনা।

২ প্রতেকবার আবেদন এর সময় ইমেইল পরিবর্তন করলাম প্রত্যেকটা প্রফেসরের রিসার্চ ইন্টারেষ্ট অনুযায়ী।

৩ আবেদনের সময় সাব্জেক্টে Application for a internship/ job লিখলাম ।

আনুমানিক তিন কি চার মাস পরে এক জায়গা থেকে ইন্টারভিউ এর মেইল পেলাম। বলে রাখি আমাকে ডাকছিল ইন্টার্নশীপ এর জন্য , আমাকে কিছু প্রশ্ন করল সাব্জেক্ট রিলেটেড তারপর টাইম এর অনান্য কথাবার্তা , এই ফাঁকে আমি বললাম আমাকে পে করলে সেটা আমার জন্য ভাল হয়। এটা পরিস্কার যে লজ্জা পাওয়া যাবে না, এমন না যে এটা বললে জব হবে না । তারপর সে বলল তার বস এর সাথে আলাপ করে জানাবে। পরে জবটি আমি পাই HiWi হিসেবে।

পরিশেষে আমি বলব লেগে থাকতে হবে , অনেক ডেডিকেশান থাকতে হবে । অনান্য জব এর সাথে HiWi জব এর পার্থক্য হল আপনি এইখানে একাডেমিক এর সাথে অ্যাটাচ থাকতে পারবেন। HiWi পাওয়ার জন্য অনেক হাই স্কিল (কিছু পজিশান ব্যতীত) লাগে না , ব্যাসিক কিছু ধারনা থাকতে হয়। প্রত্যেকটা জব এ ওরা আপনাকে আগে শিখাবে অথবা প্রটোকল দিবে।

মাস্টার থিসিস প্লাস ইন্টার্নশীপ পাওয়া

জার্মানিতে মাস্টার্স থিসিস খুবি গুরুতপূর্ন একটা বিষয় , মাস্টার্স এর পরে যে কোনো জব অথবা পি এইচ ডি প্রোগ্রামে আবেদন করলে ইন্টারভিউইয়ের সময় আপনাকে থিসিস সম্পর্কে অবশ্যই জিজ্ঞেস করবে। এই বার আসি আমার কথায়, আমার কোর্সে ইণ্টার্নশীপ বাধ্যতামূলক , আমাকে ইন্টার্নশীপ ও থিসিস দুইটাই করতে হবে।আমার সাব্জেক্টে কোন বাংলাদেশী বড় ভাই না থাকায় অনান্য শহরে বসবাসরত অনেকের সাথে আলাপ করে যেটা বুঝলাম কোনো রিসার্চ কোম্পানী অথবা ইন্সটিটিউট এ থিসিস করতে পারলে ওই ল্যাবে বা কোম্পানী তে জব বা পি এইচ ডি হওয়ার চান্স বেশি থাকে ইউনিভার্সিটির তুলনায়।শুর করলাম আবেদন অনেক শহরে রিসার্চ কোম্পানী এবং তাদের রিসার্চ প্রোজেক্ট দেখে যেটা আমার ইন্টারেষ্ট এর সাথে ম্যাচ করে।আমি যেহেতু ইকলজির তাই ইকলজি রিলেটেড ডিপার্ট্মেন্ট গুলাতে আবেদন করি যেগুলার রিসার্চ মোটামুটি মাইক্রোবায়োলজির সাথে রিলেটেড। আমি ম্যাক্স প্লাংক এ HiWi করা অবস্থায় আমাকে থিসিস করব কিনা জিজ্ঞেস করছিল , তখন আমি ২য় সেমিস্টারে ছিলাম । আমি তখন রাজি হই নাই কারন আমি দেখতাম যারা তখন থিসিস করত পাশাপাশি অন্য জব করত অনেক কষ্ট হইত। বায়োলজি তে থিসিসে প্রচুর সময় দিতে হয় , স্কিল গেইন করতে হয়। তখন আমি প্ল্যান করলাম আগে কিছু ইউরো সেব করে তারপর ভাল্ভাবে থিসিস করব অথবা পেইড থিসিস করব।

আবেদন করতে করতে সেই আগের মত হতাশ কোথা ও থেকে কোন রিপ্লাই পেলাম না । অনেক হতাশ ছিলাম ।কারন পেইড থিসিস পাওয়া খুবই কঠিন ছিল ।যাক হতাশ হয়ে দিন যেতে লাগল আর আমি কোর্স করতে থাকলাম । অবশেষে একদিন এক প্রফেসর তার ডিপার্ট্মেন্টে আবেদনের এক মাস পর আমকে মেইল দিল যে তুমি কি এখন ও ইন্টারেস্টেড এর মাঝখানে অনেক জায়গা থেকে রিজেকশান খেলাম, আমি মনে মনে বললাম আমি তো সবসময ইন্টারেস্টেড ।এর পর পরের সপ্তাহে ইন্টারভিউ দিতে গেলাম অন্য শহরে , রিসার্চ কোম্পানী টা অন্য শহরে ছিল । আমি তখন ও জানতাম না আমার থিসিসে কিছু পে করবে নাকি করবে না কারন আমি আবেদনে পে করার কিছু উল্লেখ করি নাই ।কিন্তু ট্রপিক টা আমার পছন্দ ছিল তাই গেলাম । আমার মোটামুটি যতটুকু স্কিল ছিল সেটা দিয়ে কনভিন্স করার চেষ্টা করলাম ।তার পর সে আমাকে বলল তুমি ৭৫% ফিট কিন্তু তুমি যদি ইনশিউর কর তুমি পরিশ্রম করবা তাহলে আমি তোমাকে সিলেক্ট করব । তারপর সে জিজ্ঞেস করল তুমি এই শহরে কিভাবে লিভিং এক্সপেন্স বহন করবে কারন আমাকে আগের শহরের সব জব ছেড়ে আসতে হবে, আমি বললাম আমাকে ফান্ড দিলে ভাল হয যদি পসিবল হয় । তারপর সে রাজি হয়ে গেল , আমাকে ৮০০ ইউরো করে দিবে বলল কিন্তু আমাকে থিসিস প্রজেক্ট এর উপরে ৭০ ঘন্টা (মাসে)কাজ করতে হবে । আল্লাহর অশেষ কৃপায় , ভাগ্য এবং ডেডিকেশান সব মিলিয়ে কাকতলীয় ভাবে হযে গেল পেইড থিসিস। পাশাপাশি আমি প্যারিসে একটা পেইড ইন্টার্নশীপ পাই কিন্তু আর যাওয়া হয় নাই ।প্রফেসর আমাকে বাসা খুজে দিল এবং তার বাসায রাখল প্রথম দিন যেটা জার্মান দের থেকে পাওয়া খুবি রেয়ার।প্রফেসর থাইল্যান্ডের ছিল। এই ল্যাবে আমি এখন ও আছি , আলহামদুলিল্লাহ একটা পেপার সাযেন্টিফিক জার্নালে পাবলিশড হইছে দুই তিন দিন আগে আমার মাস্টার্স থিসিস এর উপরে। এখন ও ইউনিভার্সিটি তে থিসিস সাবমিট করিনি । পাশাপাশি এই ল্যাবে আমার বাধ্যতামুলক ইন্টার্নশীপ টা করেছি ।

পেইড মাস্টার থিসিসের জন্য কিছু পরামর্শ

১ একটা রিসার্চের অনেক ধাপ থাকে । কিন্তু যে বিষয় গুলো জানা জরুরী Molecular work, Bioinformatics, Data analysis, Writing—Original draft preparation, review and editing এইখানে যে সব পারতে হবে এমন না দুই একটা সাইডে ভাল নলেজ থাকলে ভাল ।যেমন আমি Data analysis, Molecular work (not fully expert), Writing কিছুটা পারতাম।

২ ইউনিভার্সিটে যে কোর্স গুলোতে Molecular work আছে সে গুলা করা ভাল।

৩ ডাটা এনালাইসিস এ জন্য R or Python জানলে ভাল।

৪ প্রফেসরদেরকে প্রচুর মেইল দিতে হবে এবং লেগে থাকতে হবে , হাল ছাড়া যাবে না।

৫ ৩য় সেমিস্টারের শুরু থেকেই মেইল দেওয়া শুরু করলে ভাল।

মাঝে মাঝে আফসোস হয় বাংলাদেশ থেকে এই গুলা শিখে আসতে পারলে হয়ত অনেক তাড়াতাড়ি অনেক ভাল কিছু করতে পারতাম । তবুও এগিয়ে যেতে হয়, কারন আমরা সবাই এই আশায় বেঁচে আছি একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। অনেক কিছু লিখার ছিল ,ভুলে গেছি অনেক কিছু এবং সময়ের স্বল্পতার কারনে হয়ে উঠে নাই। দয়া করে সবাই ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন ।

বিজ্ঞানী মেরী কুরীর এই কথা টা ভাল লাগছে , "Be less curious about people and more curious about ideas" আমাদের চিন্তাশীল হওয়া উচিত। পরিশেষে সবার মংগল কামনা করি।

লেখক Shakhawat Hossen (Shakil) মাস্টার থিসিস Department of Soil Ecology, UFZ-Helmholtz Centre for Environmental Research, Halle (Saale), Germany তারিখ 19.06.2020

Subscribe to Our Newsletter

© BESSiG. বিনা অনুমতিতে এই ওয়েবসাইটের কোনো কন্টেন্ট অন্য যেকোন ওয়েবসাইট বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।