ব্রেমেনের গায়কেরা



"টাউন মিউজিশিয়ানস অফ ব্রেমেন" (জার্মান: ডি ব্রেমার স্ট্যাডমুসিকানটেন) একটি জনপ্রিয় জার্মান রূপকথার গল্প যা ব্রাদার্স গ্রিম দ্বারা সংগৃহীত হয়েছিল এবং ১৮১৯ সালে "গ্রিমস ফেইরী টেইলস" বইতে প্রকাশিত হয়েছিল। ছোটবেলায় রূপকথার গল্পের বই পড়তে আমরা যারা ভালবাসতাম তারা অনেকেই হয়তো এই গল্পটা পড়েছি। কিন্তু কখনও ভাবিনি একদিন আমি নিজেই এই গল্পের শহরে চলে আসব। হ্যা ব্রেমেন শহরের কথাই বলছি। জার্মানির উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে অবস্থিত একটি প্রাচীন স্টেট শহর হল ব্রেমেন।


গল্পের কাহিনি হল একটি গাধা, একটি কুকুর, একটি বিড়াল ও একটি মোরগ এই চারটি গৃহপালিত প্রাণীকে ঘিরে। এরা প্রত্যেকেই সারাজীবন তাদের শ্রম দিয়ে নিজ নিজ মালিকদের সাহায্য করেছে। কিন্তু বার্ধক্যের কারণে আগের সেই কাজ করার শক্তি আর নেই। গাধা সারাজীবন তার মালিকের জন্য ভুট্টার বস্তা বহন করে কারখানাতে নিয়ে যেত। কিন্তু মালিক দেখল যে বয়স হয়ে যাওয়ায় গাধাটা আর আগের মত কাজ করতে পারে না। তাই সে গাধাটার সাথে দুর্ব্যবহার শুরু করে। গাধাটা এতে খুব কষ্ট পায় এবং সিদ্ধান্ত নেয় যে সে এই বাড়ি ছেড়ে ব্রেমেনের পথে রওনা হবে এবং গানবাজনা করে রোজগার করবে। এতেই তার জীবন ভালভাবে কেটে যাবে।


যেতে যেতে গাধার সাথে একে একে দেখা হয় কুকুর, বিড়াল আর মোরগের সাথে। বয়সের ভারে কুকুর আর আগের মত শিকার ধরতে পারেনা, বিড়াল আর ইঁদুর তাড়াতে পারে না, মোরগও আগের মত ভোরে ডাক দিয়ে ঘুম ভাঙগাতে পারে না। তাই সবার মালিকের কাছ থেকে তারা দুর্ব্যবহারের শিকার হয়। সবার দুঃখের কথা শুনে গাধা সবাইকে তার সাথে ব্রেমেনের পথের সঙ্গী হতে বলে এবং তাদেরকে বোঝায় যে ওখানে তারা একসাথে গানবাজনা করে সুখেই দিন কাটাতে পারবে। গাধার প্রস্তাবে সবাই রাজি হয়।


পথে যেতে যেতে একটা বনের ভিতর রাত হয়ে গেল। রাত কাটানোর জন্য ওরা একটা জায়গা খুঁজতে থাকে। দূরে একটা বাড়িতে আলো দেখতে পায় তারা। বাড়ির কাছে যেতেই ওরা বুঝতে পারে যে এটা একটা ডাকাত দলের বাড়ি। ডাকাতি করা দামি জিনিস-পত্র ভাগ-বাটোয়ারা শেষে ডাকাতেরা রাতের খাবারের আয়োজন করছিল। গাধা ও তার সঙ্গীরা বুঝতে পারল যে কোনভাবে এই ডাকাতদের তাড়াতে পারলে তারা নিশ্চিন্তেই এই বাড়িটাতে রাত কাটাতে পারবে। তারা ডাকাতদের ভয় দেখানোর জন্য একটা বুদ্ধি বের করল। গাধা তার সামনের ক্ষুর দুটি জানালার প্রান্তে রাখল, কুকুরটি গাধার পিঠে লাফিয়ে উঠল, বিড়ালটি কুকুরের উপরে এবং মোরগটি উড়ে এসে বিড়ালের মাথায় বসল। এরপর তারা সকলে মিলে নিজ নিজ সংগীত পরিবেশন শুরু করল। কুকুরের ঘেউ ঘেউ, বিড়ালের মিউমিউ, মোরগের কুকুরুকু এবং গাধার ডাকের আওয়াজে এক অদ্ভূত ও বিকট শব্দের সৃষ্টি হল । এই শব্দে ঘরের জানালার কাচ ভেংগে পড়ল। ডাকাতরা ভয়ঙ্কর ঝাঁকুনিতে লাফিয়ে উঠল এবং ভাবল এটি একটি ভূত। ভীষণ ভয়ে তারা পালিয়ে গেল বনের ভিতর।


চার গায়কেরা তো খুব খুশি। তারা ঘরের ভিতর ঢুকে আরামে খাওয়া-দাওয়া করে আলো নিভিয়ে দিয়ে যার যার পছন্দমত জায়গায় ঘুমিয়ে পড়ল। গাধাটি শুয়ে পড়ল উঠানে খড়ের গাদার উপর, দরজার পেছনে কুকুর, উষ্ণ ছাইয়ের কাছে চুলার উপর বিড়াল এবং মোরগটি পার্চে বসে পড়ল। দীর্ঘ যাত্রার ফলে ক্লান্ত থাকায় তারা সকলেই খুব শীঘ্রই ঘুমিয়ে পড়ল।


মধ্যরাতের কিছুক্ষণ পরে ডাকাতরা দূর থেকে লক্ষ্য করল যে বাড়ির সমস্ত আলোকসজ্জা নিভে গেছে এবং সমস্ত কিছু শান্ত আছে বলে মনে হচ্ছে। ডাকাত দলের নেতাটি ডাকাতদের মধ্যে একজনকে বাড়িতে গিয়ে তদন্ত করতে বলল। ডাকাতটি সবকিছু শান্ত দেখতে পেল, একটি আলো জ্বালানোর জন্য সে রান্নাঘরে গেল। চুলার কয়লার ভিতর বিড়ালের জ্বলন্ত চোখ চিকচিক করছিল। কাছে যেতেই ডাকাতের গলায় লাফিয়ে উঠে ধারাল থাবা দিয়ে মুখে খামচে দিল। ডাকাত আতঙ্কিত হয়ে পিছনের দরজা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করল কিন্তু কুকুরটি সেখানে শুয়ে ছিল। লাফ দিয়ে ডাকাতের পায়ে কামড়ে ধরল সে। ডাকাত যখন উঠানে খড়ের গাদার পার্শ্বে দৌড়ে গেল তখন গাধা তার পেছনের ক্ষুর দিয়ে জোরে লাথি মারতে লাগল। এর মধ্যে মোরগও ঘুম থেকে জেগে গেল এবং চিৎকার করে ডেকে উঠল কুকুরুককু বলে। ডাকাত তার নেতার কাছে ফিরে এসে বলল, "ওই বাড়িতে ভয়ঙ্কর ডাইনী আছে। সে আমার উপর থুতু ফেলেছিল এবং লম্বা আঙ্গুল দিয়ে আমার মুখটি আঁচড়ালো এবং দরজার পাশে একজন লোক ছুরি নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে আমার পায়ে ছুরিকাঘাত করল। খামারবাড়িতে একটি কালো দানব রয়েছে যা আমাকে কাঠের একটি মুগুর দিয়ে আক্রমণ করেছিল এবং ছাদে একজন বিচারক বসে আছেন, যিনি বলেছিলেন, "আমার কাছে এই বজ্জাত পাজিটাকে ধরে আন"। "তাই আমি যতটা পারলাম তত দ্রুত পালিয়ে গেলাম।" সেই সময় থেকে ডাকাতরা আর বাড়ির কাছে যাওয়ার সাহস পায়নি। তবে চারজন ব্রেমেন সংগীতশিল্পী এটিকে এত পছন্দ করেছিল যে তারা আর বাড়ি ছেড়ে যেতে চাইল না এবং সেখানেই তারা সকলে সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে থাকল।


গল্পের শিরোনামের সাথে মিল রেখে আসলে ব্রেমেনের গায়কেরা বাস্তবে কখনই ব্রেমেন শহরে এসে পৌছায়নি। কিন্তু প্রশ্ন হল গল্পে তারা ব্রেমেন শহরেই কেন আসতে চেয়েছিল? ব্রেমেনের অফিসিয়াল নাম "ফ্রেই হ্যান্সস্টাড্ট ব্রেমেন" অর্থাৎ ফ্রি হানস্যাটিক সিটি নামেই এটি বিশ্বে পরিচিত। এর কারণ হল ব্রেমেন হানস্যাটিক লীগ অন্তর্ভুক্ত নগরী ছিল যারা প্রচুর বাণিজ্য করত। হানস্যাটিক লীগ নিয়ে বিস্তারিত না হয় অন্য একদিন লিখব। অনেক পণ্য ব্রেমেন বন্দর থেকে প্রেরণ করা হত বা অন্য দেশ থেকে ক্রয় করে ব্রেমেন বন্দরে আনা হত। "ফ্রি" এর অর্থ হল এটি স্থানীয় ডিউকস এবং প্রিন্সদের থেকে স্বাধীন ছিল। টাউন মিউজিশিয়ানরা তাদের সুরক্ষিত ভবিষ্যতের সন্ধানে ব্রেমেনের দিকে যাত্রা করেছিল। সুন্দর এই শহরটিতে একটি ভাল জীবনের আশা কেবল বর্তমান দখলদারদের দ্বারা ভাগ করা হয়নি। এটি বহু মানুষের প্রত্যাশা যারা অনাদিকাল থেকেই জার্মানির বিভিন্ন অঞ্চল এবং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ব্রেমেনে এসেছেন। অসাম্প্রদায়িক হানস্যাটিক শহরের ঐতিহ্য হিসেবে ব্রেমেন অভিবাসনকে সমৃদ্ধি হিসাবে বিবেচনা করে এবং এর ফলে এখানে একটি সক্রিয় ও স্বাগতিক সংস্কৃতি রয়েছে।


ব্রেমেনের গায়কেরা নিঃসন্দেহে হানস্যাটিক শহরের গর্ব এবং আনন্দের অন্যতম নিদর্শন। তাই ব্রাদার্স গ্রিমের জনপ্রিয় রূপকথার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসাবে ১৯৫৩ সালে জেরহার্ড মার্কস দ্বারা এখানে একটি ব্রোঞ্জের মূর্তি নির্মিত হয়। আজও টাউন হলের সামনে ঝকমকে উজ্জ্বল এই মূর্তিটি ব্রেমেনের হৃদয়ে দাঁড়িয়ে আছে।


লিখেছেনঃ সালমা ফেরদৌস অমি

Subscribe to Our Newsletter

© BESSiG. বিনা অনুমতিতে এই ওয়েবসাইটের কোনো কন্টেন্ট অন্য যেকোন ওয়েবসাইট বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।