Broken Dreams (বাস্তবতার আলোকে লেখা)

লিখেছেন Shahab U Ahmed


অনেকের কাছেই স্বপ্নের দেশ জার্মানি। বহু বাংলাদেশী শিক্ষার্থী ইতিমধ্যেই জার্মানিতে উচ্চশিক্ষার জন্যে পাড়ি জমিয়েছে জার্মানিতে। ব্যাচেলর এবং মাস্টার্স লেভেলে শিক্ষার্থীর সংখ্যাই সর্বাধিক। কিছু শিক্ষার্থী সাফল্যের সাথে তাদের পড়াশুনা চালিয়ে যাচ্ছে কিংবা শেষ করছে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, শিক্ষার্থীদের বড় একটা অংশ বিভিন্ন কারণে অনিশ্চয়তায় ভুগছে।

এর কারণ হিসেবে নিচে কিছু বিষয় আলোচনা করা হলো:

১. পছন্দের সাবজেক্ট না পাওয়া: বাংলাদেশে ব্যাচেলর এ যে কোর্স ছিল, অনেক ছাত্র-ছাত্রী জার্মানিতে মাস্টার্স করতে এসে ওইরকম কোনো কোর্স খুঁজে পায়না, কিংবা কোন মিল পায়না । কেউ যদি নিকটবর্তী কোনো কোর্সও পায়, সেটা নিয়েও অনেককে হাবুডুবু খেতে দেখা যায়। বলা বাহুল্য আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষা আর জার্মান উচ্চশিক্ষা মুদ্রার এপিঠ ওপিঠের মতোই।

২. বিশ্ববিদ্যালয় পরিবর্তন: বাংলাদেশিদের মধ্যে অনেকেই পছন্দের কোর্স খুঁজে না পেয়ে এক বিশ্ববিদ্যালয় পরিবর্তন করে অন্যটিতে ভর্তি হয়। কিন্তু চেঞ্জ করেও অনেকে পূর্বের পড়াশুনার সাথে মিল খুঁজে পায়না। যার ফলে সৃষ্টি হয় রাজ্যের হতাশার। তাছাড়া শহর, বিশ্ববিদ্যালয় চেঞ্জ এর সাথে মোটা অংকের টাকা পয়সাও জড়িত। নতুন পরিবেশ, শহর, জব নিয়ে অনেকেই শঙ্কায় থাকে।

৩. কোর্স কারিকুলাম নিয়ে অসন্তুষ্টি: বলা হয়ে থাকে জার্মান শিক্ষা ব্যবস্থা অনেক কোয়ালিটি সম্পন্ন, অনেক সমৃদ্ধ ইত্যাদি ইত্যাদি। কথাটি সত্যি হলেও বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থার পুরোপুরি ভিন্ন চিত্র এখানে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা মূলত থিওরি ভিত্তিক, আর এখানে মাস্টার্স কিংবা অনার্সেও পড়াশুনা গবেষণা ভিত্তিক। প্রচুর ল্যাব ওয়ার্ক করা, সাইন্টিফিক জার্নাল পড়া, বিভিন্ন softwarwe নিয়ে কাজ করা সহ আরো অনেক বিষয় গুলুর সাথে cope up করা এত সহজ বিষয় না। এজন্যে শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ ঝরে পড়ে।

৪. পড়াশুনা-জব ভারসাম্য করতে না পারা: আমাদের বাংলাদেশিদের সাধারণত ভারী কোনো কাজ কর্ম করার অভ্যাস নেই, ছোট বেলা থেকেই অনেক আদর ভালোবাসায় আমাদের বেড়ে উঠা। এর এজন্যেই এখানে পার্ট টাইম জব করতে গিয়ে অনেকেই হতাশায় ভেঙে পড়ে। ২-৩ দিন জব করলে শারীরিকভাবে যে কেউ দুর্বল অনুভব করে, এর ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়া কিংবা পড়াশুনায় ১০০% মনোযোগ দেয়া অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। অনেকে পড়াশুনা-জব ভারসাম্য রক্ষা করতে না পেরে পড়াশুনাকেই সেকেন্ডারি অপসন মনে করে মূল স্রোত থেকে হারিয়ে যায়।

৫. আর্থিক সমস্যা: জার্মানিতে আগত বাংলাদেশিদের অধিকাংশই মধ্যবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে আসা। ব্লক একাউন্ট এর টাকা মূলত প্রথম বছরেই ফুরিয়ে যায়, এর পর বাকি সময়টা মূলত পার্ট টাইম জব নির্ভর। নিজে চলা, পরিবারকে আর্থিক সাপোর্ট দেয়া, ভিসা এক্সটেনশন, ইন্সুরেন্স মেইনটেইন করতে যেয়ে কমবেশি সবাইকেই আর্থিক সংকটে থাকতে হয়। কেউ কেউ এ সংকটে পড়ে উচ্চশিক্ষার স্বপ্নের মৃত্যু ঘটিয়ে দেশে ফেরত যায়।

৬. একাকী পথ চলা: মানুষ সামাজিক জীব, সবাই জানি। কিন্তু প্রবাসে এসে মানুষ হয়ে যায় একাকী। ভালো বন্ধু পাওয়া এখানে সৌভাগ্যের ব্যাপার। বাজার করা থেকে শুরু করে রান্না বান্না, পড়াশুনা-জব মেইনটেইন করা সবই নিজেকে একাই করতে হয়। মানুষ ১ জন, সামলাতে হয় সবকিছু, এজন্যে অনেকেই একাকিত্বে ভোগে। তাছাড়া পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন থেকে অনেক শিক্ষার্থী মানসিক যন্ত্রনায় ধীরে ধীরে ট্র্যাকচুত হয়ে পড়ে।

৭. ক্যারিয়ার নিয়ে শঙ্কা: পড়াশুনা শেষে রিলেটেড জব পেলেই কেবল এদেশে স্থায়ী বসবাসের কথা আসে। মূলত জার্মানীতে আই টি, ইঞ্জিনারিং জব প্রচুর। অন্য যেকোনো সাবজেক্টে পড়াশুনা করে ফুল টাইম জব ম্যানেজ করা সত্যিকার অর্থে সহজ না। আর তাই অনেকেই ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার নিজে দুশ্চিন্তায় ভুগে। তাছাড়া বাংলাদেশ থেকে ভালো ক্যারিয়ার গড়া অনেকেই জার্মানিতে এসে ভবিষ্যত নিয়ে দুর্ভাবনায় থাকে।

আরো একটি তথ্য না দিলেই নয়, জার্মানিতে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীদের সাফল্যের হার অনেক কম। ২ বছরের মাস্টার্স কোর্স কিংবা ৩ বছরের ব্যাচেলর কোর্স করতে এসে জীবনের মূল্যবান ৮-১০ বছর (কিছু ক্ষেত্রে আরো বেশি) সময় ব্যয় করাদের সংখ্যাটা অনেক। সবমিলে, বিদেশে উচ্চশিক্ষা নেয়ার আগে সুবিধা-অসুবিধা, অপ্রিয় বাস্তবতাগুলো জেনে আসাটাই মঙ্গলজনক। কেবল রঙিন ছবি আর সুন্দর পোস্ট দেখে জীবনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত না নেয়াটাই সর্বোত্তম।

আমাদের সুন্দর স্বপ্নগুলোর অপমৃত্যু না ঘটুক, এটাই প্রত্যাশা......

এই লেখা পড়ার পরে কোন প্রশ্ন থাকলে বা মতামত দিতে চাইলে অথবা কাউকে ট্যাগ করতে চাইলে আমাদের ফেইসবুক গ্রুপ থেকে করতে পারেন

Subscribe to Our Newsletter

© BESSiG. বিনা অনুমতিতে এই ওয়েবসাইটের কোনো কন্টেন্ট অন্য যেকোন ওয়েবসাইট বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।