জার্মানিতে প্রথম দিন



রাত ৩ টা,২৬মার্চ,২০১৯। অচেনা এক দেশের উদ্দেশ্য নিজ জন্মভূমি ছেড়েছিলাম। এটাই ছিল প্রথম বিদেশ যাত্রা। তাই খুব এক্সাইটেড ছিলাম। আমার সাথে ছিলো আরো দুইজন। প্রায় ১৪-১৫ ঘন্টা জার্নি শেষে যখন Frankfurt পৌছালাম শিরশির করা একটা ঠান্ডা অনুভব করলাম। দেশের ঠান্ডার চেয়ে এটা একদম আলাদা। খুব ঠান্ডা একটা বাতাস। যেহেতু প্রথম আগমন, তাই মোবাইলে কোন সিম ছিল না। Frankfurt airport এ আধাঘন্টার ফ্রি wifi দিয়ে বাসায় জানালাম নিরাপদে পৌছেছি। ফ্লাইট নেমেছিল দুপুর ১২ টাই। আমার গন্তব্য Kaiserslautern। আগে থেকে ফ্লিক্সবুসের টিকেট কাটা ছিল। বাস ছাড়ার সময় ছিল সম্ভবত দুপুর ১৩,৩০। সময়ের আগে এয়ারপোর্ট বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে দাড়ালাম। কিন্ত হায়, ফ্লিক্সবুসের দেখা নাই। দুপুর দেড়টা গড়িয়ে আড়াইটা, আড়াইটা গড়িয়ে সাড়ে ৩টা। Kaiserslautern, Saarbruken গামী ফ্লিক্সবুস আসে না। অস্বাভাবিক ক্ষুদায় গা কাপছিল। কাতার এয়ারলাইন্স এর লবণ দিয়ে আলু সিদ্ধ আর আপেল খেয়ে প্রায় বিশ ঘন্টা।

এমন এক জায়গায় বাস স্টপ যেখানে আশেপাশে কোন দোকান নেই। আবার ওই জায়গা থেকে নড়তেও পারছিলাম না কারণ যেকোন সময় বাস এসে পড়বে। ওখানে দুটো ভেন্ডিং ম্যাশিন ছিল কিন্ত আমাদের কোন পয়সা ছিল না, তাই কিছু কিনতে পারছিলামনা ম্যাশিন থেকে। কয়েকজন আগুন্তুকের কাছে নোট দিয়ে পয়সা এক্সচেঞ্জ করতে চাইলাম। তাও পেলাম না। ঘড়ির সময় প্রায় সাড়ে চারটা, তখনো বাসের দেখা নাই। বাধ্য হয়ে আসে পাশে হাটতে লাগলাম। কোন দোকান পাওয়া যায় কিনা। প্রায় দশ-পনেরো মিনিট ঘুরাঘুরি করেও কিছু পেলাম না। অবশেষে এয়ারপোর্টের এক বাস ড্রাইভারকে দেখলাম। দেখে ইন্ডিয়ান মনে হলো তাই ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করলাম আসে পাশে কোন খাবারের দোকান আছে কিনা। সে জানালো খাবারের দোকান সব এয়ারপোর্টের ভিতরে। আশে পাশে আর তেমন কিছু নেই। খুব হতাশ হলাম। কারণ, যেকোন সময় বাস আসতে পারে তাই আমার পক্ষে আবার এয়ারপোর্টের ভিতরে যাওয়া সম্ভব না। আমাদের হতাশ দেখে বাস ড্রাউভার জিজ্ঞেস করলো আমরা কোথা থেকে এসেছি। বললাম বাংলাদেশ। তিনি তখন বাংলায় জিজ্ঞেস করলো " বাংলাদেশের কোথায়?" আমি অবাক হয়ে বললাম " চিটাগাং"।উনি বললেন এটা তো আমার শশুর বাড়ি।একজন বাঙালি খুজে পাওয়া ছিল ওই মূহুর্তে অনেক বড় প্রাপ্তি। তাকে সমস্যার কথা খুলে বললাম। তিনিও জানালেন তিনি বাসে করে আমাদের এয়ারপোর্টের ভিতরে নিয়ে যেতে পারেন। কিন্ত আমরা বাস মিস করার রিস্ক থাকে এতে। তিনি এক প্যাকেট বিস্কুট খাচ্ছিলেন ( বড় সাইজের)। ওটা আর এক বোতল পানি আমাদের দিলেন। বললেন এটা আমি খুললাম মাত্র, আপনারা খেয়ে নিন। আমি নিতে চাইলাম না। জোর করেই দিল। বললেন আমার জায়গায় আপনি হলেও সেইম কাজ করতেন।

বিস্কুট নিয়ে আবার বাসের জন্য অপেক্ষা। সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা বাজেও বাস আসেনা। বাধ্য হয়ে সিদ্ধান্ত নিলাম ট্রেইনে যাবো। ইন্সট্যান্ট টিকেট, জনপ্রতি ৪০ ইউরো( ফ্লিক্সবুস এই টাকা কয়দিন পর ফেরত দিয়েছিল)। আর কোন উপায় নেই। ট্রেইনে করে কিভাবে আসছি নিজেও জানিনা। হাতড়ে হাতড়ে চলে আসা যাকে বলে।Kaiserslautern hbf পৌছালাম তখন রাত প্রায় এগারোটা। কিছু ভাই রিসিভ করেছিল এখানে। কিন্ত এখানেও কোন বাস ছিলনা। প্রায় ২ কিলোমিটার, লাগেজ নিয়ে আবার হাটার পথ। ভয়াবহ এক জার্নি। সত্যি বলতে গেলে ওই বিস্কুটগুলো খেয়ে সেদিন হাটার শক্তি পেয়েছিলাম। আমি জানিনা উনার নাম কি, কিংবা কই থাকেন। হতে পারে তিনি এই গ্রুপেই আছেন। যদি উনি এই পোস্টটি দেখে থাকেন, তার প্রতি অজস্র কৃতজ্ঞতা আমার। যদিও অনেকে মনে করবেন একটা বিস্কুটের প্যাকেট, এমন আর কি!!। কিন্ত ওই মুহুর্তে এটা আমাকে দাড়িয়ে থাকার শক্তি দিয়েছিল। আমি এই উপকারটার কথা কখনোই ভুলবোনা।

আমাদের বাংলাদেশীদের মধ্যে প্রায় সবখানেই কম বেশি দ্বিধা বিভক্তি আছে। কিন্ত দিন শেষে এই স্বদেশী ভাইয়েরাই সব কিছুতে কম বেশি এগিয়ে আসে। সেসব বাংলাদেশী ভাইদের প্রতি কৃতজ্ঞতা, যাদের সহযোগিতা পেয়ে জার্মানি পর্যন্ত আসা।


মোহাম্মদ এমদাদুল ইসলাম কাইসার্সলাউটার্ন, জার্মানি।

Subscribe to Our Newsletter

© BESSiG. বিনা অনুমতিতে এই ওয়েবসাইটের কোনো কন্টেন্ট অন্য যেকোন ওয়েবসাইট বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।