Scholarship নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা এবং DAAD Scholarship এর কিছু কথা





লিখেছেনঃ মুহাম্মদ সাহেদুল আলম



দুপুরে ডিপার্টমেন্টে গিয়েছিলাম একটা ছোট মিটিং এ। কথা হচ্ছিল – কি করব মাস্টার্স শেষে। একজন বলে বসল, তুমি পিএইচডি করতে চাও কোথায়? আমি কিছুটা হতাশ হয়ে বললাম – নিজেকে পিএইচডি করার যোগ্য মনে হয় না।


আমার কথা শুনে পাশে বসা এক প্রফেসর কিছুটা বিরক্ত হয়ে অনেক বড় এক বয়ান দিলেন। শেষে আসার সময় বললেন, “তুমি অন্যকে দেখে ভাবছ, তুমি কিছু না। এর মানে এই না যে, যারা পিএইচডি করছে সবাই অনেক বেশি জানে। তুমি নিজের দূর্বলতা জান, ঐটাকে পুঁজি করে আগাও – সফল হতেও পার! যোগ্য না, এটা কোন গ্রহণযোগ্য উত্তর না!”


স্কলারশিপের বেলাও আমাদের বেশিরভাগের, বিশেষ করে যাদের সিজিপিএ তথাকথিত কম, গরীব কোন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, শিক্ষকতা কিংবা গবেষণায় পেশা না – এই এক সমস্যা হয়! আমরা সচারচর স্কলার হিসেবে যাদের দেখি, তাদের কোয়ালিফিকেশন দেখে নিজেরাই একটা মিথ তৈরি করে নেই – আমাকে দিয়ে হবে না! চেষ্টা না করে কি করে বলি যে, হবে না!


নিজের পরিচয় দিয়েই আসল কথা শুরু করি। আমি বাউল, পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষিবিদ হিসেবে গ্র্যাজুয়েশন করেছি। এরপর প্রায় ৬ বছর চাকুরী করে জার্মানীর বন ইউনিভার্সিটিতে ফের আবার মাস্টার্স করছি। দালিলিক ভাষায় DAAD Scholar আর নিজের বিশ্বাস জার্মান মানুষের দানে পড়ছি।




*** প্রথমেই বলে নিচ্ছি স্কলারশিপ এবং প্রফেসর কিংবা প্রজেক্ট ফান্ড এর মাঝে অনেক তফাৎ। স্কলারশিপ এর পেছনে বিশেষ ম্যানডেট থাকে। বিশেষ পরিকল্পনায় দেয়া হয় সিলেকশন। আর DAAD তো আরও ইউনিক। ***


গত একবছর ধরে চলমান তাদের একটা সার্ভেতে অংশগ্রহণ করে বিষয়গুলো আরও পরিষ্কার হয়েছি। DAAD এর পার্সোনেল কিংবা সম্পর্কিত ব্যক্তিদের মতামতও বুঝতে চেয়েছি অনেক সময়। কি চায়, কেন চায়?

অনেক সময় দেখবেন, সুপার প্রোফাইল। কিন্তু DAAD তাকে নিচ্ছে না। আবার আমার মত ব্যাকবেঞ্চারও তথাকথিত স্কলার হয়ে ঘুরে বেড়ায়।


প্রাইভেট হোক আর নিচের দিকের সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় হোক, কার যে লেগে যাবে- কেবল DAAD জানে। আমার যতটুকু বোঝার, স্কলারদের নিয়েও তারা আলাদা গবেষণা করে, এমনকি বিশ্ববিদ্যালয় নিয়েও!

স্কলারশিপ পেতে হলে সবার আগে যেটা দরকার তা হল কঠিন সংকল্প - পাই না পাই - হেরে যাব না। না পাওয়াটা আমার ব্যার্থতা না, তাদের সীমাবদ্ধতা। তাই বলে - এর কভার লেটার, ওর সিভি, তার প্রোপোজাল দিয়ে আবার স্কলারশিপ আশা করাটাও অন্যায়।


*** উনারা তাকেই সাধারনত স্কলারশিপ দেন, যাকে দিয়ে ভবিষ্যতে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও মৌলিক কিছু হবে, মানুষের কল্যানে কিংবা পৃথিবীর কল্যাণে। ****


আবার কারও হল না মানেই, তার অযোগ্যতা - এমনও না। অনেক সময় নানা সীমাবদ্ধতার কারনে অনেক যোগ্য প্রার্থীকে বাদ দিতে হয় সিলেকশন কমিটিকে!

স্কলারশিপ পাবার পর আমার কাছে যত প্রশ্ন ছিল, তার বেশিরভাগই ছিল - রেজাল্ট কেমন লাগে/আপনার প্রোফাইলটা বলবেন!

আমি আমার প্রোফাইল বললাম, ধরে নিলাম আমার চাইতে কারও রেজাল্ট ভাল, পাব্লিকেশন দুইটা বেশি ..... প্রজেক্ট ১ টা বেশি ... স্কলারশিপ হয়ে যাবে! এই ভুল ধারনার জন্যই অনেকের স্কলারশিপ হয় না। স্কলারশিপের সিলেকশন হয় সামষ্টিক দৃষ্টিকোন থেকে, রেজাল্ট দিয়ে না।

প্রথমেই বুঝতে হবে, স্কলারশিপ এক ধরনের উন্নয়নমূলক প্রোগ্রাম - যা প্রধানত দেয়া হয় অনুন্নত/উন্নয়নশীল বিশ্বের সম্ভাবনাময়ী শিক্ষক কিংবা গবেষকদের। কিংবা এমন সম্ভাবনাময়ী শিক্ষার্থীদের, যাদের ভেতর ভবিষ্যতে দেশকে দেবার মত কিছু একটা খুঁজে পায় সিলেকশন কমিটির মেম্বাররা।


***একজন স্কলারকে ট্রেইনড করা হয়, যাতে করে সে দেশে গিয়ে আরও হাজার ছাত্রকে ট্রেইনড করাতে পারে। আরও ভাল ভাবে গবেষনায় নিজেকে উজাড় করতে পারে। বাকিরাও যাতে করে নিজ সেক্টরে ভাল কিছু করতে পারে।***

আমি ঘুরে ফিরে DAAD Scholarship কে ফোকাস করব। কিন্তু, এর থেকে বাকি স্কলারশিপেরও কিছুটা ধারনা নেয়া যাবে।


*** DAAD Masters Scholarship এর আবশ্যিক কিছু শর্ত:

১. যাদের মাস্টার্স করা আছে, তারা মাস্টার্স এর ফান্ড পাবে না। সুতরাং, মাস্টার্স করা থাকলে তা অস্বীকার কিংবা লুকিয়েই সাধারনত অনেকে দরখাস্থ করে। খুব রেয়ার কিছু ঘটনা আছে, যেখানে দ্বিতীয় মাস্টার্স এর অনুমতি পাওয়া যায়। কিন্তু সে ক্ষেত্রে খুব শক্ত মোটিভেশনাল লেটার লাগে।

২. অনার্স এর পর দুবছর চাকুরীর অভিজ্ঞতা লাগবে। চাকুরীটা রিলেটেড হতে হবে। প্রফেসরদের ল্যাবে রিসার্চ এসিট্যান্ট জবও গ্রহণ যোগ্য। বেসরকারী, সরকারী জব - যৌক্তিক সব কিছুই গ্রহণযোগ্য।

৩. বয়সটা ত্রিশ এর নীচে হওয়া ভাল।

৪. চার বছরের বেশি স্টাডি গ্যাপ না হওয়া ভাল

৫. প্রতিষ্ঠিত দুজন রেফারীর মৌলিক রেফারেন্স লেটার।

৬. রেজাল্ট নিশ্চিত করে বলা কঠিন। তবে আমি বলি যদি ৩.২৫ + রেজাল্ট থাকে, তবে হতাশ না হয়ে চেষ্টা করা উচিৎ। একটা পজিটিভ কিছু হতেই পারে!

৭. একটা মৌলিক সিভি

৮. রিসার্চ প্রপোজাল

৯. মৌলিক মোটিভেশনাল লেটার

১০. ইংরেজি দক্ষতা স্কোর

DAAD PhD Scholarship এও অনেকটা এমনই। তবে বাংলাদেশের মাস্টার্স ইউরোপিয়ান ক্রেডিট সিস্টেমে একটু পেছানো। সুতরাং, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কিংবা গবেষক ছাড়া সরাসরি পিএইচডি পাওয়া কঠিন। তবে অসম্ভব নয়। যাদের বাংলাদেশের মাস্টার্স, তাদেরে অনেককেই এখানে এসে বেশ কিছু কোর্স করতে হয়।


***Scholarship মূলত কাদের জন্য?

১. বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক (সরকারী/বেসরকারী) - কারন, তারা দেশে ফিরে হাজারো শিক্ষার্থীর মাঝে জ্ঞান বিতরন করতে পারবে।

২. গবেষক (সরকারী/বেসরকারী) - গবেষনার নতুন দিগন্ত এরা দেশে সূচনা করতে পারবে

৩. উন্নয়ন সংস্থার কর্মী কিংবা চাকুরীজীবি

৪. সম্ভাবনাময়ী ছাত্র-ছাত্রী - যারা ভবিষ্যতে কিছু করতে পারবে বলে বিশ্বাস (প্রশ্ন হচ্ছে, কি করে এটা তারা বুঝবে? পাঠানো দরখাস্থ, প্রোপোজাল, মোটিভেশনাল লেটার, রেফারেন্স লেটার ... এগুলো একজনকে বিচার করার জন্য যথেষ্ঠ।)

এর বাইরেও নানা ক্যাটাগরীতে সিলেকশন দেয়া হয়। নারী ক্ষমতায়ন, অবশ্যই উল্লেখ করবার মত দিক।


*** কি কি প্রস্তুতি প্রয়োজন:

১. রেজাল্ট: ৩.২৫+ (এর কম হলেও বিভিন্ন দেশে চেষ্টা করা যেতে পারে। বিশেষ করে প্রফেসর ফান্ড)। সত্যায়িত কাগজপত্র এবং গবেষনা পাব্লিকেশন।

২. ইংরেজী দক্ষতার সার্টিফিকেট (যতটা দরকারী, ততটাই। যদি বলা থাকে, ৬.৫; তার মানে এই নয় যে কেউ ৭.৫ পেয়েছে বলে স্কলারশিপ পেয়ে গেল!)।

৩. স্কলারশিপ নির্ধারন, প্রফেসর খোঁজা, ইমেইল করা।

৪. একটা মৌলিক সিভি।

৫. একটা মৌলিক মোটিভেশনাল লেটার।

৬. মৌলিক রিসার্চ প্রপোজাল।

৭. দুটো মৌলিক রেফারেন্স লেটার এবং এক্টিভ রেফারী

একবার আমি আমার প্রফেসরকে আমার রিসার্চ রিলেটেড কিছু প্রশ্ন নিয়ে ইমেইল করেছিলাম। উনি আমার মেইলের উত্তর দেন নি। পরে ল্যাবে যাবার সময় পথে তার সাথে দেখা। তিনি আমাকে ডেকে নিয়ে খুব সরল ভাষায় বললেন, “আমি প্রতিদিন হাজার খানেক ইমেইল পাই। শখানেক স্প্যাম লিস্টে পাঠাই যাতে করে ফিউচারে ডিস্টার্ব না করতে পারে। অনেক ইমেইল এর রিপ্লাই করাও সম্ভব হয় না। তোমার কোন শিডিউল দরকার নেই, দরকার পরলে আমার রুমে চলে আসবা, ঐ খানে কথা বলব।”

আমাদের অনেকেই পূর্ণ প্রস্তুতি ছাড়া প্রফেসরদের ইমেইল করা শুরু করেন। রেজাল্ট হাতে নেই, ইংলিশ স্কোর নেই, প্রফেসরের ইন্টারেস্ট জানা নেই - ইমেইল পেয়েই দু-চার কলম লিখে দিলাম। “স্যার, আমি উমুক-তমুক, এই ইচ্ছা, সেই ইচ্ছা, আপনি কি আমাকে একটা সুযোগ দেবেন!” আমি মনে করি, এটা একটা ভুল পদক্ষেপ।

প্রফেসররা এসব ব্যাপারে খুবই বিরক্ত হন, আর ইমেইল পাঠিয়ে দেন স্প্যাম এ। তখন মেইল সার্ভিস, ইমেইলকে স্প্যাম হিসেবে ডিটেক্ট করে বেশিরভাগ সময়েই স্প্যামে পাঠানোর কথা। সুতরাং আমি বলি, পূর্ণ প্রস্তুতি ছাড়া এই টাইপের ইমেইল থেকে বিরত হওয়া উচিত।


(রেজাল্ট, সত্যায়িত কাগজপত্র )

আমি প্রথমেই ক্যাম্পাসে গিয়ে আমার সব পেপার এর দুই কপি করে সত্যায়িত করে আনলাম।সার্টিফিকেট, মাকর্সশীট আর পড়ার মাধ্যম ইংরেজী। এরপর সেগুলোকে শিক্ষা মন্ত্রণালয় আর পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয় থেকে সত্যায়িত করে আনলাম। এসএসসি আর এইচএসসি আমি নোটারী করেছি।


(মৌলিক সিভি )

একটা সিভি বানিয়েছি নিজের মত করে। এর সিভি, ওর সিভি কাট পেস্ট করাটা খুব একটা সমিচীন না। ইউরোপে ইউরোপাস সিভিটা মডেল সিভি। আর আমার যেহেতু জব এক্সপেরিয়েন্স আর কিছু আর্টিকেল ছিল, সিভিটা মোটামুটি বড় হওয়াতে কেটে কুটে, যতটা শর্টকাট করা যায় - চার পেইজে নিয়ে এসেছিলাম। নেটে সার্চ দিলেই ইউরোপাস সিভির ফরমেট পাওয়া যায়। ঐ ফরমেটে এমন অনেক কিছু আছে, যা আমাদের নেই, সেগুলো আমি বাদ দিয়ে নিয়েছি।


(এক্টিভ রেফারী )

দুজন রেফারীকে আমি জানিয়ে রেখেছি, দরখাস্থ করা শুরু করেছি, আপনারা একটু খেয়াল রাইখেন। অনেক সময়, আমরা এমন কিছু রেফারী সিভিতে দিয়ে রাখি, যাদের সাথে আমাদের একাডেমিক বা প্রফেশনাল কোন মিল নেই! আবার কিছু রেফারী আছে, যারা আসলে এক্টিভ না।


(ইংরেজী দক্ষতার সার্টিফিকেট )

সিভিতে ভাষাগত দক্ষতা উল্লেখ ছিল। আমি বলি নীলক্ষেত থেকে গিয়ে টোফেল বা আইএলটিএস এর বই আর সিডি কিনে এনে বাসায় ২-৩ মাস প্রক্টিস করে, পারলে একদুইটা মক টেস্ট দিয়ে পরীক্ষা দিলেই ভাল একটা স্কোর পাওয়া সম্ভব। কোচিং করার মাঝে আমি শুধু অর্থ অপচয় দেখি।

অন্তত যারা ইংরেজী মাধ্যমে অনার্স করেছে, তাদের আমি কখনই বলব না কোচিং এর ভুচুং ভাচুং এ যেতে।


(গবেষনা পাব্লিকেশন)

আমার জীবনের একটা বড় ভুল ছিল গবেষনা পাব্লিকেশন। আমি না বুঝে আমার খুব ভাল কিছু কাজ পাব্লিশ করেছি তথাকথিত জার্নাল এ। এখন আফছোস হয়, কিন্তু ভুল হয়ে গেছে। তার মাঝেও ভাল কিছু পাব্লিকেশন ছিল কর্মজীবনে। আমাদের শিক্ষকদেরও একটা বড় অংশ পাব্লিশ করে ইন্টারন্যাশানাল জার্নাল অফ উগান্ডা টাইপ জার্নালে! আমরা আর কিইবা করব! তারপরও, যদি একবারে না পারা যায়, আমি বলব, সুযোগ থাকলে এক দুইটা রিসার্চ পাব্লিকেশন থাকা ভাল। কারন, প্রফেসররা আমাদের দুর্বলতা জানে। তারপরও পাব্লিকেশন দেখলে, তারা ধরে নেয় - ঘষা মাজা করে একে দিয়ে হয়ত ভাল কিছু করা যাবে। পাব্লিকেশন থাকলে, সেগুলো সিভিতে মেনশন করা দরকার।

কোন সাবজেক্ট গুলা পড়ছি, গান গাইতে পাড়ি, নাচতে পাড়ি এইগুলা সিভিতে না থাকাই উত্তম।


(স্কলারশিপ নির্ধারন, প্রফেসর খোঁজা, ইমেইল করা )

স্কলারশিপ ঠিক করে আমি আমার সাবজেক্ট রিলেটেড বিশ্ববিদ্যালয় এবং ফ্যাকাল্টি কিংবা ইনস্টিটিউট খুঁজে বের করেছি। সেখান থেকে প্রফেসর খুঁজে পেয়েছি। তারপর Researchgate (https://www.researchgate.net/) এ গিয়ে তার পাব্লিকেশন আর কাজের ধরন দেখেছি। সেই পেপারগুলো ভাল করে পরেছি। কিছু পেপার দেয়া থাকে না। আমি সেগুলোর জন্য রিসার্চগেইট এই তাকে অনুরোধ করেছি। প্রফেসর আমাকে পরে সেই পেপার পাঠিয়েছেনও। উনি আমার সম্পর্কে একটা ধারনাও পেয়েছেন যে, আমি তার গবেষনায় আগ্রহী।

কিছু ধারনা পাবার পর, আমি তাকে একদিন তার দেশের সময় সকালের দিকে মেইল করেছি। চার পাঁচ লাইনের মেইল। আমি অমুক দেশের তমুক। আমি বর্তমানে এই করছি। এখন নিজেকে আরও দক্ষ করবার জন্য আমি উচ্চশিক্ষায় আগ্রহী, যাতে করে আমি আরও ভাল সেবা দিতে পারি আমার সেক্টর এ। আপনার ল্যাবে“ক” নিয়ে কাজ হয়, আমি এই ব্যাপারের “ক৭” নিয়ে আগ্রহী।

তারপর নিচে ছোট করে বলে দিয়েছি, বিরক্ত করলে মাফ করবেন। আপনার সদয় বিবেচনার জন্য আমি সিভিটা এটাচ করেছি, আপনার সময় সুযোগ মত দেখবার বিনীত অনুরোধ। ধন্যবাদ।

প্রফেসর আমার মেইল পেয়ে আমার রেফারীদের মেইল করেছেন। কারন উনি জেনে গেছেন, আমি তার রিসার্চ ফলো করি এবং তার পরবর্তী কাজের ধরনও আমি বুঝে গেছি। আমার রেফারীরা পজেটিভ বলার পরই উনি আমাকে রিপ্লাই করেছেন। এরপর কমিউনিকেশন চলল। উনি বললেন, কি করতে চাও, একটা ধারনা দাও। আমি তাকে চারটা ধারনা দিলাম - উনি একটা খুব পছন্দ করলেন। বললেন, ফুল প্রোপোসাল দাও।

একটা কথা খুব পরিষ্কার বলি, মেইল কাট কপি পেস্ট করা যাবে না, কোন ভাবেই না। এইটা প্রফেসরকে আকর্ষন করার মত হতে হবে। শর্ট কিন্তু আসল আবেদন উপস্থাপন করার মত হতে হবে।


(রিসার্চ প্রপোজাল )

রিসার্চ প্রপোজাল দেখেও কিন্তু প্রফেসররা আইডিয়া করতে পারেন, কি হবে এই ছাত্রকে দিয়ে। কারওটা কাট পেস্ট না করে, নেট থেকে একটা মডেল দেখে, বেসিক একটা প্রপোজাল দাঁড় করানো উত্তম। Summary, Introduction, Background/Justification, Objectives, Material Methods, Time Plan with activity, Conclusion , References - এই থাকে সাধারনত রিসার্চ প্রপোসাল এ। বাজেট উল্লেখ করা হয় কিছু ক্ষেত্রে। প্রপোসাল ঠিক করার পর আমি বাকি প্রস্তুতি নিলাম।


(রেফারেন্স লেটার )

দুইটা রেফারেন্স লেটার নিলাম আমার রেফারীদের কাছ থেকে। সাধারনত আমাদের প্রফেসররা এত ব্যস্ত যে, ছাত্রদের জন্য তারা দুকলম লিখতে পারেন না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা বলে, লিখে নিয়ে এসো, সাইন করে দেব। এর ফলে যা হয়, ছাত্ররা কাট কপি পেস্ট নিয়ে আসে! কারও কারও রেফারেন্স লেটারে যা লেখা থাকে, তার কিছুই সে পারে না।


রেফারেন্স লেটার টা মৌলিক হবার দরকার। আমার একটা রেফারেন্স লেটার ছিল ব্রিটিশ এক গবেষকের কাছ থেকে আনা। উনি আমার সুপারভাইসর ছিলেন আমার কর্মক্ষেত্রে। নিজে লিখে, নিজে প্রিন্ট করে, সাইন করে আমার হাতে দিয়ে উনি বলেছিলেন, “গুড লাক সাহেদ!”


মাত্র ৫-৬ টা লাইন ছিল। সাহেদ এতদিন যাবত এই কাজ করছিল। এই এই ব্যাপারে সে অভিজ্ঞতা নিয়েছে। সে অমুক তমুক কনফারেন্সে তার গবেষনা রেজাল্ট নিয়ে প্রবন্ধ/পোস্টার উপসাথাপন করেছে। আমি পূর্ণ বিশ্বাস করি, তাকে যদি উমুক স্কলারশিপটা দেয়া হয়, তবে উচ্চশিক্ষা নিয়ে সে আরও ভাল করতে পারবে। আমি এই ভবিষ্যত সম্ভাবনাময়ী তরুনের উপর আস্থাবাদী এবং তার জন্য শুভকামনা করি।

অথচ, আমরা এক পেইজ লিখেও রেফারেন্স লেটার শেষ করতে পারি না। আমি যদি সবই জানি, তবে ওরা আমাকে কি শেখাবে!


(মোটিভেশনাল লেটার )

এরপর লিখলাম একটা মোটিভেশনাল লেটার। কেন আমি এই স্কলারশিপটা চাই কিংবা কেন তারা আমাকে দেবে। তিন পাতার লেটার, যার পুরোটা নিজের চিন্তায় লেখা। নো কাট কপি পেস্ট।

শুরু করেছি, অামার ছোট একটা একাডেমিক আর প্রফেশনাল পরিচয় দিয়ে। তারপর আমি কেন উচ্চশিক্ষা নিতে চাই, তার প্রেক্ষাপট। কি বিষয়ে দক্ষ হতে চাই, তার বর্ণনা। দক্ষ হয়ে কি করতে চাই, তার একটা সমাপনী।

এবং সব শেষে নিজের একটু ব্যতিক্রমী ভাবনা। আমি বলেছিলাম, “আমি দেশ বিশ্বাসী যতটা তার চাইতে বেশি বিশ্বাস করি মানুষে, মানবতায়। বাড়ন্ত জনসংখ্যার এই জলবায়ু পরিবর্তনের পৃথিবীতে, মানুষের জন্য খাদ্য ঘাটতি পূরণ করা অন্যতম এক বড় সমস্যা। পৃথিবী মায়ের সন্তান হয়ে, একজন মানুষ হয়ে আমি চাই এমন কোন কিছুতে অবদান রাখতে, যা খাদ্য ঘাটতি পূরণের জন্যই মনের ভেতরের একটা দৃঢ় প্রচেষ্ট। আর তৃতীয় বিশ্বের এক তরুনের এই প্রচেষ্টা বাস্তবায়নে প্রয়োজন উন্নত বিশ্বের সহযোগীতা এবং আমি বিশ্বাস করি DAAD পারে আমাকে সেই সুন্দর সুযোগটি দিতে।”


এই লেখা কপি করলে কিন্তু আম ছালা সবই যাবে, আমার এই লেখা লেখার আগে আমি যথেষ্ট শক্ত একটা ব্যাকগ্রাউন্ড তৈরি করে নিয়েছিলাম, যা এই আবেগী লেখাকে পূর্ণ সমর্থন করে। এরপর তো সিলেকশন পেয়ে ভাইবা দিয়ে অফার লেটার পেয়ে এখন প্রায় শেষ সময় পার করছি।


***একটা কথা খুব ভাল করে মনে রাখা উচিত, মোটিভেশনাল লেটার টা এমন যাতে না হয় যে - আমরা সব জানি আবার কিছুই জানি না। এটা যেন একটা ব্যালেন্সড কিছু হয়, কিছু জানি আর যা জানি না তাও আমার সম্ভাবনা।***


আমার মনে হয়, আমি আসল কথাগুলো সংক্ষেপে বলে ফেলেছি। এরপরও কারও প্রশ্ন থাকলে, এখানে প্রশ্ন করা যেতে পারে। আর নতুন কিছু জানার থাকলে, আমি ভিন্ন কোন পোস্টে তা লিখতেও আগ্রহী।

শুভকামনা।


-মুহাম্মদ সাহেদুল আলম মাস্টার্স ইন এগ্রিকালচারাল সায়েন্স এন্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট ইন ট্রপিক্স এন্ড সাবট্রপিক্স (DAAD Fellow ), ইউনি বন। পিএইচডি গবেষক (DFG Fellow), ইউনি বন।

মে ১০, ২০১৯। বন, জার্মানী।

Subscribe to Our Newsletter

© BESSiG. বিনা অনুমতিতে এই ওয়েবসাইটের কোনো কন্টেন্ট অন্য যেকোন ওয়েবসাইট বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।