UK এবং জার্মানির স্টুডেন্ট লাইফের একটা তুলনা।



প্রথমে আমার পরিচয় দিয়ে দেই। আমি বাংলাদেশে ২০০৮ এবং ২০১০ সালে যথাক্রমে এসএসসি এবং ইন্টার পাশ করার পর ২০১৫ তে কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক করি। এরপর চাকুরির জন্য পাকাপাকি কোয়ালিফিকেশনের জন্য MBA তে ভর্তি হই এবং ২ সেমিস্টার কমপ্লিট করি। মাঝখানে আমি একবার IELTS দিয়ে ৬.৫ পেয়েছিলাম। তাই এমবিএর মাঝামাঝি হঠাত আমার বিদেশের ভুত চাপে। তাই বাবা-মার কথার উপরে জোর করেই ২০১৬ এর অক্টোবরে স্নাতকোউত্তর করতে আমি UK তে রওয়ানা দেই। UK তে মাস্টার্স কমপ্লিট করার পর আমি দেশেই বসবাস করার নিয়তে দেশে চলে আসি এবং যথারীতি ১ বছর বেকার চক্কর এবং Social Abuse ফেস করার পর আমি এখন দ্বিতীয় Bachelors করতে জার্মানি ৮ মাস ধরে আছি। তো জার্মানিতে আসার পর কিছু জিনিষ যেমন প্রচুর ভাল লেগেছে তেমন কিছু জিনিষ খুবই বিরক্ত লেগেছে। এগুলা আজকে শেয়ার করব।

১। ইউকেতে ল্যান্ড করার পর ইমিগ্রেশনে যেরকম প্রশ্নোত্তরের ,মুখুমুখি হতে হয় জার্মানিতে সেরকম আমার পরতে হয় নি। ২। ইউকেতে আমি যেদিন ইউনিতে এনরোল করি সেদিনই আমি পুরা কোর্সের ডিউরেশনসহ ৪ মাসের এক্সট্রা সহ রেসিডেন্ট কার্ড পেয়ে যাই যেটাতে ওয়ার্ক পারমিট দেয়া ছিল। জার্মানিতে পৌছার পর আমার ভিসা এক্সটেনশনসহ ওয়ার্ক পারমিটের কাগজ পাইতে প্রায় ২ মাস লেগেছে যেটা আমাদের মত গরীব ছাত্রদের জন্যে খুবই পেইন। অনেকের শুনি ৬ মাসও লাগে। আবার আপনি জার্মানিতে একবারে ভিসা পাবেন না। কয়দিন পরপর এক্সটেনশন করতে হবে। ভিসা অফিসার তার মর্জিমত আপনাকে ৬ মাস, ৮ মাস, ১ বছর, ২ বছরের ভিসা দেবে।

৩। ইউকেতে হেলথ ইনস্যুরেন্স পুরা বছরে ১৫০ পাউন্ড এবং সাথে ওষুধের দাম ফ্রী। জার্মানিতে একজন নতুন ছাত্রের জন্য সরকারি ইনস্যুরেন্স বাধ্যতামুলক তা প্রতি মাসে ১০৮ ইউরো এবং সাথে প্রতিটি ওষুধের প্যাকের জন্যে ৫ ইউরো।

৪। ইউকেতে কোন বাসায় উঠতে গেলে কোন কাউশান এর প্যারা নেই, শুধু ২ মাসের টাকা এডভান্স নেয় । এরপর ৩ নং মাস থেকে ভাড়া দিতে হয়। মানে আপনার এক্সট্রা কোন টাকা মালিকের পকেটে যাচ্ছে না। জার্মানিতে মোটামুটি ৯০% বাসায় উঠার সময় মালিককে ৩০০-১০০০ ইউরোর একটা কাউশান দিয়ে রাখতে হয় যা আপনি বাসা ছাড়ার পর পাবেন। এবং ঐ সময় মালিক বিভিন্ন টাল্ডি-বাল্ডি, টাল-বাহানা করে ঐ কাউশানের কিছু টাকা রেখে দেয়। পুরাটা ফেরত দেয় না। এটা আমাদের গরীবদের জন্যে খুবই বিরক্তিকর। কারণ এই একটা পরিমাণ টাকা পুরো বছরই কোন না কোন মালিকের পকে্ট থেকে পকেটে ঘুরছে, যেটা আদৌ আপনার টাকা না কারন আপনি এটা প্রয়োজনে ব্যাবহার করতে পারছেন না।

৫। ইউকেতে আপনি যখন ইচ্ছা যে কোন সিটি, যেকোন বাসায় মুভ করতে পারবেন, সেখানে সিটি রেজিস্ট্রেশনের মত কোন প্যারা নাই। জার্মানিতে আপনি কোন সিটিতে মুভ করলে আপনার ১৪ দিনের মধ্যে ঐ সিটিতে রেজিস্ট্রেশন করতে হবে নতুবা বড় অংকের একটা জরিমানা গুনতে হবে।

৬। ইউকেতে রেডিও বিল বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব নাই। জার্মানিতে আপনি রেডিও শোনেন অথবা নাই শোনেজ, এখানে আপনার রেডিও বিল পে করতে হবে। আপনি যদি ভুলে পে না করেন, তাহলে এখানেও আপনার জরিমানা গুনতে হবে। আবার বিষয়টি বুঝতে যদি আপনি ওদের কাস্টমার সার্ভিসে কল করেন, তাহলে ওরা আপনার সাথে এক অক্ষরও ইংরেজিতে কথা বলবে না। সো আপনার ফ্লুয়েন্ট জার্মান ট্রান্সলেটর লাগবে।

৭। ইউকেতে আমি কোথাও ছারপোকা ফেস করি নাই, তবে থাকতে পারে। আর আপনি যদি কোন বাসায় ছারপোকা আমদানি করেন তাহলেও কোন জরিমানা টরিমানার প্যারা নাই। জার্মানিতে অনেক বাসাতেই ছারপোকা আছে, এবং ভয়ের বিষয় হল, আপনাকে যদি কোন মালিক তার বাসায় আপনি ছারপোকা আনছেন এটা প্রমান করে দিতে পারে, তাহলে সর্বনিম্ন ৮০০ ইউরো থেকে সর্বোচ্চ ১০০০০ ইউরো আপনাকে গুনতে হতে পারে। এ সম্পর্কে গ্রুপে Kazi Sourav ভাইয়ের একটা পোস্ট আছে পরে নিবেন। মজার বিষয় হল এসব ল্যান্ডলর্ড আপনাকে রুমের চাবী গোছানোর সময়, এ ব্যাপারে এক অক্ষরও বলবে না। আর একবার আপনাকে ছারপোকা ধরলে কবর পর্যন্ত ফলো করবে।

৮। ইউকেতে প্রচুর পরিমানে বাংলাদেশি থাকায় সবখানেই বাংলা দোকান ও রেস্টুরেন্ট আছে। আপনি বাংলাদেশে না থাকার কোন অভাব বোধ করবেন না। কাঠালের বিচিও কিনতে পাবেন। জার্মানিতে এরকম বাংলাদেশি পণ্যের সহজলভ্যতা নাই।

৯। ইউকেতে প্রচুর ব্ল্যাক জব আছে, যেটা জার্মানিতে খুব কম এবং জার্মানিতে ট্যাক্সের পরিমাণ অনেক বেশি।

১০। ইউকেতে আপনার ওয়ার্ক পারমিটের সিস্টেম হচ্ছে সপ্তায় ২০ ঘন্টা যেটা জার্মানিতে ভিন্ন হিসাব। জার্মানিতে হচ্ছে বছরে ১২০ ফুল ডে। এ হিসেবে জার্মানি খুবই ভাল একটা দেশ। কারণ একটা শিফট হয় ৮ ঘন্টার। তবে ইউকেতে আপনি যদি সপ্তায় দুটো ৮ ঘন্টার শিফট নেন তাইলে ১৬ ঘন্টা হয়ে যায়। যার মানে আপনি আরেকটা ৮ ঘন্টার শিফট পাচ্ছেন না। তারমানে প্রতি সপ্তাহে আপনার ৪ ঘন্টা করে লস হয়ে যাচ্ছে। আর এই ২০ ঘন্টার পেরা থাকার কারণে সামার হলিডে আর ক্রিসমাস হলিডে ছাড়া আপনি কোথাও ফুল্টাইম কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন না। এই কারনে ছাত্রদের বাধ্য হয়ে বিভিন্ন পাকিস্তানি/ ইন্ডিয়ান/ বাংলাদেশি রেস্টুরেন্টে ক্যাশে ফুলটাইম কাজ করতে হয় আর সে সুবাধে মালিকরা তাদের ঘন্টায় মিনিমাম ওয়েজ রেট না দিয়ে প্রায় এর অর্ধেক রেটে কাজ করায়। এর সাথে ১ জনকে দিয়ে ২-৩ জন এমপ্লয়ির কাজ করিয়ে নেয়। এই দিক দিয়ে জার্মানি অনেক ভাল। ১২০ ডের হিসাব হওয়ায় আপনি বছরে টানা ৬ মাস ফুল টাইম কাজ করতে পারবেন। বাকি ৬ মাস আপনি মিনি জব করতে পারবেন। এই মিনি জব হল ৪৫০ ইউরো মাসিক পেমেন্টের জব, যেটার কোন ট্যাক্স অথবা হিসেব নাই। এই সুবিধা আপনি ইউকেতে পাবেন না।

১১। ইউকেতে পুলিশ যদি আপনাকে বাই চান্স ধরে ফেলে, আপনি বেশি কাজ করে ফেলেছেন তাহলে লাথি মেরে আপনাকে বাংলাদেশে ডিপোর্ট করে দিবে। যেটা জার্মানিতে করবে না। জরিমানা করতে পারে অথবা ৪০% ট্যাক্স কেড়ে নিতে পারে।

১২। ইউকেতে যদি আপনি নির্ধারিত সময়ের ভিতরে পড়া কমপ্লিট করতে না পারেন তাহলেও আপনাকে ডিপোর্ট করে দিবে অথবা আপনি যদি পরপর ২ সেমিস্টার ৭৫% কোর্সে পাশ করতে ব্যার্থ হোন তাহলে আপনাকে ইউনিভার্সিটি ডিসকন্টিনিউ করে দিবে। তখন আপনাকে বলা হবে ১ মাসের ভিতরে দেশে ফিরে যেতে। জার্মানিতে অনেককে দেখবেন ৪ বছরের কোর্স ১০ বছরে করতেছে আর ২ বছরের কোর্স ৭ বছরে করতেছে। ১ সেমিস্টারে ১ টা কোর্স, আরেক সেমিস্টারে ২ টা কোর্স করতেছে। তারপরও আপনাকে বের করে দিবে না। অনেক সুযোগ দিবে।

১৩। জার্মানিতে আপনি কোর্স কমপ্লিট করার পর অনেক জব পাবেন এবং ভাষা শিখে গেলে এখানেই সেটেল হয়ে যেতে পারবেন।

১৪। জার্মানিতে প্রায় সব ইউনিভার্সি্টিতেই সেমিস্টার টিকেট আছে যেটা দিয়ে আপনি খুব কম টাকায় আপনার পুরা স্টেট ঘুরতে পারবেন যেই সুবিধা ইউকেতে নাই। আবার সেমিস্টার টিকেটের হিসাব বাদ দিলে জার্মানির ট্রান্সপোর্টেশন খরচ ইউকের দ্বিগুণ। এখানের ট্যাক্সি ভাড়া পুরাই ডাকাতি। তার মানে দাঁড়ায় আপনাকে শুধু জার্মানিতে এসে প্রথম বছর বিভিন্ন ধাক্কা সহ্য করে নিতে হবে। এরপর আপনি মোটামুটি সেট হয়ে যাবেন। আপনাকে আর বাধ্য হয়ে দেশে ফিরে যেতে হবেনা। আর ইউকেতে আপনি টিকতে হলে দিনশেষে আইনস্টাইন লেভেলের জ্ঞানী হওয়া লাগবে নতুবা একটা ব্রিটিশ সিটিজেন মেয়ে বিয়ে করতেই হবে।

তবে আপনি যদি লাইফ এনজয় করতে চান তাহলে ইউকের লাইফ অনেক কালারফুল। আর এখানকার মানুষগুলাও জার্মানদের তুলনায় অনেক ফ্রেন্ডলি এবং ফুর্তি প্রিয়। আমি ইউকেতে তিনটা বিদেশিনির সাথে রিলেশন করেছি এবং তার সাথে অনেক বন্ধু পেয়েছিলাম যাদের সাথে বন্ধুত্বের খাতিরে ভালবাসার আদান-প্রদান হয়েছিল। কিন্তু জার্মানিতে রিলেশন ত দুরের কথা একটা বন্ধুও বানাতে পারি নাই 😞। কিন্তু আমি মনে করি এ বিষয়ে আমার আরো অনেক কিছু জানার এবং শেখার আছে তাই আমি এটা উপরের লিস্টে যোগ করি নি।

তাহলে সব কথার শেষ কথা হল আপনি যদি ধনীর আদুরে দুলাল হোন তাহলে বিশাল অংকের টিউশান ফি দিয়ে ইউকেতে কোন প্রকার ভেজাল ছাড়া ফুর্তির লাইফ এনজয় করেন কিন্তু আপনি যদি আমার মত গরীব হন এবং বিদেশে সেটেল হওয়ার ইচ্ছা পোষন করেন তাহলে জার্মানি ইউকে থেকে ফার মোর বেটার অপশন।

আমি কোন প্রফেশনাল রাইটার না তাই লেখার সর্বপ্রকার দোষত্রুটি আপনার ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন।

আজকের মত এখানেই সমাপ্তি।

লেখক Quazi Shahriar Rahman

এই লেখা পড়ার পরে কোন প্রশ্ন থাকলে বা মতামত দিতে চাইলে অথবা কাউকে ট্যাগ করতে চাইলে আমাদের ফেইসবুক গ্রুপের মাধ্যমে দিতে পারেন।

Subscribe to Our Newsletter

© BESSiG. বিনা অনুমতিতে এই ওয়েবসাইটের কোনো কন্টেন্ট অন্য যেকোন ওয়েবসাইট বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমে ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।